সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের এক দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গত ২৯ জুলাই রাজধানীর প্রবেশমুখে পাঁচটি স্থানে বিএনপির অবস্থান কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি হতাশ করেছে দলটির হাইকমান্ডকে। দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা উপস্থিতি কম হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকে সেদিন তাদের জন্য নির্দিষ্ট করা স্থানে যাননি। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে দলটি আজ শুক্রবার রাজধানীতে গণমিছিলের কর্মসূচি নিয়ে নামছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যৌথভাবে একই কর্মসূচি পালন করবে।
মহাসমাবেশের পরদিন এ ধরনের একটি কর্মসূচি পালনের ব্যাপারে কোনো কোনো নেতা অনিচ্ছুক ছিলেন এমন খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। কারণ অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে বিএনপি যে শক্তি-সামর্থ্য দেখাতে চেয়েছিল সেটা পারেনি। বরং পুলিশের সামনে তারা টিকতে পারেনি। বরং আরেক দফা মামলায় জড়িয়েছে।
সে কারণে আজকের গণমিছিল কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে গত কয়েক দিন ধরে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো দফায় দফায় প্রস্তুতি সভা করেছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানী ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কম ছিল কি না, তা বলতে পারব না। আমরা পেছনে ফিরে তাকাতে চাই না। আগামীকালের (শুক্রবার) গণমিছিল কর্মসূচিতে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও কর্মসূচিতে অংশ নেবেন বলে আশা করি। এভাবে ধাপে ধাপে কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে একপর্যায়ে চূড়ান্ত আন্দোলনের পথে এগিয়ে যাব।’
তিনি বলেন, ‘অবস্থান কর্মসূচির পর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয় পুলিশ। এসব মামলায় নেতাকর্মীদের জামিন করানোসহ বিভিন্ন কারণে কিছুটা সময় নিয়ে গণমিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও এখন পর্যন্ত সব নেতার জামিন হয়নি। তাছাড়া যারা আহত হয়েছিলেন তাদের সুস্থতার জন্যও সময় নেওয়া হয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ভালোই থাকে। তবে হার্ড লাইনের কর্মসূচি হলে কিছু নেতার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে, কর্মসূচিতে বের হওয়ার আগে খবর নেন পুলিশের উপস্থিতি কেমন? তাদের মনোভাব কেমন? পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কর্মসূচিতে অংশ নেন আর সমস্যা হতে পারে জানতে পারলে নানা অসিলা খোঁজার চেষ্টা করে। একজন পুলিশের হামলায় গুরুতর আহত হলে তাকে ফেলেই তার সহকর্মীরা চলে যান। বিশেষ করে গ্রেপ্তার এড়াতে ধারেকাছেও থাকেন না নেতাকর্মীরা। পরস্পরের প্রতি পরস্পরের ভালোবাসায় ঘাটতি আছে।’
২৮ জুলাই নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আয়োজিত মহাসমাবেশ থেকে পরদিন রাজধানীর প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের অধীন নয়াবাজার ইউসুফ মার্কেট, শনির আখড়া ও মুক্তি সরণিতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিলেও ঢাকা মহানগর উত্তরের অধীনে গাবতলী ও উত্তরায় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ নেতাদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ছাড়া উল্লেখ করার মতো জ্যেষ্ঠ নেতারা কর্মসূচিতে ছিলেন অনুপস্থিত। সেদিন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনায় নেতাকর্মীদের কম উপস্থিতি ঢাকা পড়ে। অবশ্য বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্ধারিত স্পটে হাজির হওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জায়গা দখলে নিয়ে নেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উত্তরা ও গাবতলীতে যাদের থাকার কথা ছিল তারা থাকেননি। বিশেষ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা তাদের নিজ নিজ নেতাকর্মীদের নিয়ে যথাসময়ে হাজির হননি। উত্তরার স্পটে বিএনপির কেন্দ্রীয় জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতারা অংশ নিলেও স্থানীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। ঢাকা মহানগর উত্তরের দায়িত্বশীল নেতাদের বিতর্কিত করতে এবং তাদের নেতৃত্ব ব্যর্থ দেখানোর জন্য স্থানীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কম ছিল। জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে। এটা খুবই দুঃখজনক।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, ‘ঢাকার প্রবেশমুখে আমাদের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্ধারিত তিনটি স্পটেই মিছিল ও সমাবেশ করেছি। আগামীকালের (আজ শুক্রবার) গণমিছিলের কর্মসূচিতেও বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেবেন। একটি সফল কর্মসূচি আমরা পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
গণমিছিলের রুট ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে যারা যেখানে থাকবেন : আজ বেলা ৩টায় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি রাজধানীতে গণমিছিল করবে। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি বাড্ডা সুবাস্তু টাওয়ারের সামনে থেকে শুরু করে মালিবাগ আবুল হোটেল পর্যন্ত এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি কমলাপুর স্টেডিয়াম থেকে মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত গণমিছিল করবে। গণমিছিলের অনুমতির জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে চিঠি দিয়েছে বিএনপি। সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রাজধানীতে গণমিছিলের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে বিএনপি।
এদিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ঢাকা মহানগর উত্তরের গণমিছিলে নেতৃত্ব দেবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার সঙ্গে থাকবেন জ্যেষ্ঠ নেতারা। গণমিছিল সমন্বয় করবেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান। তাকে সহযোগিতা করবেন মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর বিএনপি দক্ষিণের গণমিছিলে নেতৃত্ব দেবেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তার সঙ্গে জ্যেষ্ঠ নেতারা থাকবেন। গণমিছিল সমন্বয় করবেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম। তাকে সহযোগিতা করবেন মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন। এ ছাড়া বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সম্পাদক, সহ-সম্পাদক এবং নির্বাহী সদস্যরা নিজ নিজ সুবিধামতো ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের গণমিছিলে অংশগ্রহণ করবেন।
সমমনা দলগুলো কর্মসূচির স্থান : বিএনপির পাশাপাশি আজ বিকেল ৪টায় ১২ দলীয় জোট বিজয়নগর পানির ট্যাংকের সামনে, বেলা ৩টায় জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট পুরানা পল্টন আলরাজী কমপ্লেক্সের সামনে, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) কারওয়ান বাজার এফডিসিসংলগ্ন এলডিপি অফিস সামনে, গণফোরাম ও পিপলস পার্টি মতিঝিল নটর ডেম কলেজের উল্টো দিকে গণফোরাম অফিসের সামনে, গণ অধিকার পরিষদের একাংশ অফিসের সামনে, আরেক অংশ (ডক্টর রেজা কিবরিয়া-ফারুক হাসান নেতৃত্বে) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) মালিবাগ মোড় থেকে সন্ধ্যা ৭টায়, সমমনা পেশাজীবী গণতান্ত্রিক জোট সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এবং লেবার পার্টি সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে গণমিছিল শুরু করবে। আর বিকেল ৪টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে গণমিছিল শুরু করবে গণতন্ত্র মঞ্চ।
গত ১২ জুলাই নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে সরকারের পদত্যাগে এক দফার কর্মসূচি ঘোষণা দেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে রাজধানীর ১২টি জায়গা থেকে যুগপৎভাবে একই কর্মসূচির ঘোষণা দেয় গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, এলডিপি, গণ অধিকার পরিষদ, গণফোরাম, এবি পার্টিসহ ৩৭টি রাজনৈতিক দল ও জোট।