দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী বিএনপির মধ্যে আলোচনা বা সংলাপ হওয়া নিয়ে সরগরম আলোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে। সংলাপের সম্ভাবনার এই উঁকিঝুঁকির মধ্যে এর উদ্দেশ্য ও ফল নিয়ে আলোচনা চলছে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও। দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেছে, সংলাপে বসলে বিএনপি কী অর্জন করতে পারবে, আর তা অর্জন না হলে কোন পথে যাবে রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের ভাষ্য হচ্ছে, আলোচনার উদ্যোগ সফল হলে তারা তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সেগুলো অর্জন করতে চাইবেন। তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে আলোচনা ফলপ্রসূ করার। কেননা, সেটি না হলে কঠোর কর্মসূচিতে যেতে হবে। এতে দেশে নতুন করে সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
সংলাপ নিয়ে দু-দলের সাধারণ সম্পাদক ও মহাসচিব পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যের পর এ নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যে বিশ্লেষণের মধ্যে দলটির নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, এই উদ্যোগ বর্তমান সরকারের লোকদেখানো কাজ ছাড়া কিছু নয়। সরকার নিজের ছকমতোই নির্বাচন করবে। সরকার দেশের মানুষ ও বহির্বিশ্বকে দেখাতে চাইছে যে তারা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে আগ্রহী। এই প্রয়োজনেই হয়তো তারা আলোচনায় বসতে চায়। আবার কোনো কোনো নেতার ভাষ্য হচ্ছে, বিদেশি শক্তি ও আন্দোলনের চাপে সরকার এখন নমনীয়। তাই বাধ্য হয়েই সংলাপের কথা বলছে।
বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংলাপ নিয়ে যেসব কথাবার্তা চলছে, তারা তা বোঝার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি তারা প্রস্তুতিও রেখেছেন। দু-দলের মধ্যে সংলাপ হলে তারা অন্তত তিনটি বিষয়ে ছাড় দেবেন না। এর মধ্যে অন্যতম হলোÑ মামলা। দলের শীর্ষপর্যায়ের যারা এরই মধ্যে মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন তারা যদি দণ্ড মওকুফ না পান তাহলে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। আবার তৃণমূল নেতাকর্মীদের নামে হওয়া মামলা প্রত্যাহার না হলে বিএনপি নির্বাচনে সব কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারবে না। ফলে এটি বড় ধরনের সংকট হিসেবে দেখছে দলটি। এর সমাধান হলে বর্তমান যে রাজনৈতিক সংকট তার অনেকটাই শিথিল হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকালীন সরকার। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সরকারপ্রধান কে থাকবেন, সেই সরকার কীভাবে পরিচালিত হবে এ বিষয়টি তারা নিশ্চিত হতে চাইবে। তৃতীয় বিষয়টি হলো নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে সেই কমিশনের অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থার বিষয়ে তারা আলোচনা করবেন। এসব বিষয় বিএনপি নেতাদের হোমওয়ার্ক পর্যায়ে থাকলেও তারা এখন আন্দোলনে রয়েছেন একদফার। সেটি হচ্ছেÑ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগ।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সংলাপের যে বক্তব্য আসছে, তা আপাতত আমলে নিচ্ছেন না তারা। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পেলে ভেবে দেখবেন।
আর দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক (ওবায়দুল কাদের) বলেছেন, তারা তখনই আলোচনা করতে রাজি আছেন যখন বিএনপি সব শর্ত বাদ দিয়ে আলোচনায় আসবে। আমার প্রশ্ন, আপনারা যে সরকারে বসে আছেন, আপনারা কি সাংবিধানিকভাবে বৈধ? সবার আগে আপনার নেত্রীকে (শেখ হাসিনার সরকার) পদত্যাগ করতে হবে। তারপর আলোচনা প্রসঙ্গে আসতে পারে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা এবং জাতিসংঘসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চাপে রয়েছে সরকার। এদিক থেকে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। তাই আগ বাড়িয়ে আপাতত ছাড় দিয়ে আলোচনায় বসার চিন্তা নেই বিএনপি নেতাদের। আগ বাড়িয়ে যাওয়া মানে রাজনৈতিক পরাজয়। একই সঙ্গে কোনোভাবেই ২০২৪ সালের নির্বাচন ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো করে পার হতে দেবেন না তারা। তাই কঠোর কর্মসূচির বিষয়টি সামনে এজেন্ডা আকারে আলোচনার টেবিলে রাখবেন।
বিএনপির উদারপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত এমন অন্তত দুজন নেতা মনে করেন, সংলাপ সফল হলে রাজনৈতিক সমঝোতা হবে। আর রাজনৈতিক সমঝোতা হলে সংবিধান পরিবর্তন না করেও নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। যেমন প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সব দলের প্রতিনিধি নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার হতে পারে। তার প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা যেতে পারে নিরপেক্ষ কাউকে। সংসদে না থাকলেও টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী নিয়োগের বিধান সংবিধানে রয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো বিষয়ে আমাদের হোমওয়ার্ক রয়েছে। আন্দোলনের যেমন আছে, নির্বাচনের প্রস্তুতিও আমাদের আছে। আবার আলোচনায় বসলে সে প্রস্তুতিও আমাদের রয়েছে। কিন্তু কিছু ফান্ডামেন্টাল (মৌলিক) বিষয়ে আমরা ছাড় দেব না। সরকার জনগণের দাবি মেনে সংলাপ করতে চাইলে আমরা খোলা মনে কথা বলব। কিন্তু সংলাপ ব্যর্থ হলে মূল্য দিতে হবে এই জাতিকে। এমনিই আওয়ামী লীগ এই জাতিকে মূল্যহীন করে রেখেছে।’
