বাঙালি যে শান্তিপ্রিয় ও সংস্কৃতিপ্রিয় জাতি তা আর দেখা যাচ্ছে না

আপডেট : ২২ মে ২০২০, ০১:২৬ পিএম

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও গবেষক, জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগ্রামে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশেও বাঙালিকে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে। ভাষা আন্দোলন প্রজন্মের এক প্রাগ্রসর প্রতিনিধি হয়ে জাতিগঠনের এই সংগ্রামের অংশগ্রহণকারী হিসেবে যেমন তিনি সক্রিয় ছিলেন, তেমনি নিজের মেধা ও মননের অনন্য স্বাক্ষর রেখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদের জাতীয় জীবনের এক অনন্যদিশারি। সর্বজনশ্রদ্ধেয় ড. আনিসুজ্জামানকে বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালে জাতীয় অধ্যাপক ঘোষণা করে। সেই ঘোষণার পর একই বছরের আগস্ট মাসে সাংবাদিক নবনীতা চৌধুরী ড. আনিসুজ্জামানের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য সদ্য প্রয়াত ড.আনিসুজ্জামানের সাক্ষাৎকারটির প্রথম কিস্তি আজ প্রকাশিত হলো

নবনীতা চৌধুরী : ১৯৫৯ সালে আপনি ২২ বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তারপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলেন। অবসরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে পাঠদানে যুক্ত থাকলেন। এবার জাতি আপনাকে জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা দিল। আপনি শিক্ষকতা পেশাটিকে কেমন উপভোগ করেছেন?

আনিসুজ্জামান : আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমি বাংলা সাহিত্যে পড়ব এবং পেশা হিসেবে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপনা বেছে নেব। তখন অবশ্য আমি ভাবিনি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। আবছা একটা ধারণা ছিল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়, কোথাও একটা যাব। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পাঠগ্রহণ শেষে ১৯৫৯ সালের জানুয়ারি মাসে আমি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলাম। তারপর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। আগামী বছর আমার শিক্ষকতার ৬০ বছর পূর্ণ হবে। এই দীর্ঘ সময়ে আমি যে শিক্ষকতা করেছি, তা নিজে খুব উপভোগ করেছি। আমার ছাত্রছাত্রীরা কতটা করেছে, আমি জানি না। তবে একটা কথা আমার মনে হয়েছে, যেটা অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক আমাকে বলতেন। তিনি বলতেন, ‘দেখেন, আমাদের বয়স বাড়ে, কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের বয়স বাড়ে না।’ অর্থাৎ ছাত্রছাত্রীরা তো একই বয়সে ভর্তি হয় এবং একই বয়সে বেরিয়ে যায়। কিন্তু প্রতি বছর আমাদের তো বয়স বেড়ে যায়। আমি ২০০৮ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছি। তার মধ্যে শেষ পাঁচ বছরে আমি উপলব্ধি করেছি যে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আমার বেশ ব্যবধান হয়ে যাচ্ছে। কিংবা আমি যা পড়াচ্ছি, তারা তার সবটা নিতে পারছে না। তখন আমার মধ্যে উপলব্ধি বোধ কাজ করল, তফাৎটা অনেক হয়ে গেছে। এটা দূরতিক্রম্য হয়ে গেছে।

নবনীতা চৌধুরী : আপনি ক্লাসের বাইরে নিজেকে এত জড়ালেন কেন? ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতিতে আপনি অংশগ্রহণ করেছেন। তারপর ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের হয়ে কাজ করলেন। স্বাধীনতার পর সংবিধান বাংলা করার কাজে সম্পৃক্ত থাকলেন। এই যে এত সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, সেগুলোকে এত প্রয়োজনীয় মনে করলেন কেন?

আনিসুজ্জামান : আসলে আমরা যে অবস্থার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি, সেখানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালনের একটা তাগাদা ছিল। আমি শুরু করেছিলাম ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তখন আমি আইএ ক্লাসের ছাত্র। ভাষা আন্দোলনে যোগ দিলাম এবং রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হলাম। সরাসরি রাজনীতি করিনি। কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল। তার থেকে যখন মনে হয়েছে রাজপথে নামা প্রয়োজন, তখন নেমেছি। যখন মনে হয়েছে, সভা-সমাবেশে যাওয়া প্রয়োজন, তখন গিয়েছি। এটা আমাদের সময়কার দাবি বা বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের প্রজন্ম বলা হয়। সেই ভাষা আন্দোলন থেকে সেদিন পর্যন্ত গণ-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সামান্য হলেও ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করেছি।

নবনীতা চৌধুরী : এটার একটা বড় কারণ কি এই নয় যে, আপনার অবস্থান যে রাজনীতিতে, সেই রাজনীতিতে সংস্কৃতি ও রাজনীতির একটা ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে?

আনিসুজ্জামান : ভাষা আন্দোলন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টে দিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে আমরা শুধু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চাইনি, বাঙালি সংস্কৃতির সমগ্রটাই বিবেচনা করেছি। সুতরাং, আমাদের রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতি এবং সমাজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ওই যে বললাম, আমি সরাসরি রাজনীতি করিনি, কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা বরাবরই ছিল। আমি চেষ্টা করেছি, যে সব গণ-আন্দোলন হয়েছে, সেগুলোতে যুক্ত থাকার। আমার কাছে মনে হয়েছে, একজন সচেতন ব্যক্তি হিসেবে আমার কর্তব্য এসব আন্দোলনে যতটুকু পারা যায়, ততটুকু দেওয়া।

নবনীতা চৌধুরী : আমাদের রাজনীতিতে, রাজনীতি আর শিক্ষা ও সংস্কৃতির মানুষদের একে অপরকে রক্ষা করার দায় আছে কি? কেননা, আমরা যদি বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিতে যাই, আমাদের তো একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলার অঙ্গীকার আছে। এর মধ্যে কিছুটা বাস্তবতা, কিছুটা ফ্যান্টাসিও আছে। আমি জানি না আপনি একমত হবেন কি না। সেই রাজনীতি করেই ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলো। তারপরে পঞ্চাশ পেরোতে চলল, আমরা এখনো ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা বলি। তার মানে এই প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরোয়নি?

আনিসুজ্জামান : আমাদের একটা কথা ভেবে দেখতে হবে যে, আমরা যখনই বাঙালি সংস্কৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছি, তখনই অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন চলে এসেছে।

পাকিস্তানে ২৪ বছরের মধ্যে ২০ বছরই আমরা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা বলেছি। এ দেশে ইসলামি প্রজাতন্ত্র চাইনি, যুক্ত নির্বাচন হয়েছে, আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার অর্থ, অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে। ১৯৭১ সালে এটা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। এই সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের ওপর চরম আঘাত হানে। তখন সব মানুষ একে অপরকে আপন করে নিয়েছিল। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, সে সময়ে সাম্প্রদায়িকতার লেশ কোথাও দেখা যায়নি। তবে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধানের মূলনীতিতে ধর্মনিরেপক্ষতা রাখা হলেও রাজনৈতিক নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করতে চান, তাদের পুনর্বাসন হলো। সেটা থেকে ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িকতা জেগে উঠল।

নবনীতা চৌধুরী : আমার মনে প্রশ্ন জাগে, বাঙালির যে ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষুধা আছে, তারা যে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র তৈরি করতে চায়, এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার কোথা থেকে এলো? আমরা যে শুধু ‘মুসলিমের দেশ’ না বানিয়ে একে ‘আমরা সবাই বাঙালি’র রাষ্ট্র বানাতে চাই, এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার কে ঠিক করল?

আনিসুজ্জামান : এ কথা অনস্বীকার্য যে, আমরা পাকিস্তান আন্দোলনের সময় আমাদের মুসলিম পরিচয়টিকে বড় করে দেখেছি। কিন্তু যখন পাকিস্তান হলো, তখন অনেকেই অনুভব করল, পাকিস্তানে আমাদের সর্ববিধ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তখন কিন্তু আত্মপরিচয়ের বিষয়টি ঘুরে গেল। মুসলিম পরিচয়টি মুছে গিয়ে বাঙালি পরিচয়টা মুখ্য হয়ে উঠল। এটা তো একে অপরের পরিবর্তে নয়। কিন্তু কোনটার ওপর জোর দেব, সে বিষয়টি নির্ধারিত হলো। যখন মুসলিম সত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, তখনো বাঙালি সত্তা ছিল, আবার যখন বাঙালি সত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, তখনো মুসলিম সত্তাটি ছিল। কিন্তু এখানে জোর দেওয়ার বিষয়টি ছিল। বাঙালি সত্তার ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি এসেছিল মূলত অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে। আমাদের পরিবার ভারত থেকে পাকিস্তানে এসেছিল মুসলিমের আবাসভূমি বলেই। কিন্তু অচিরেই দেখা গেল, আমরা যে পাকিস্তানের জন্য এসেছিলাম, সেই পাকিস্তান কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আরেকটি কথা বলতে হবে, বাঙালি মুসলিমরা যে বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতিকে এত ভালোবাসে, তা ১৯৫২ সালের আগে বা ১৯৪৮ সালের আগে পূর্ব বাংলার মুসলিম রাজনীতিবিদরা উপলব্ধি করতে পারেননি। তারা মুসলিম লীগের উপরমহলের রাজনীতিবিদ ছিলেন। তারা যেসব বাঙালি রাজনীতিবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন যেমন এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আকরাম খাঁ কিংবা খাজা নাজিমুদ্দিন, তাদের সঙ্গে উর্দুতে বা ইংরেজিতে কথা বলেছেন। বাংলা ভাষা যে আমাদের কাছে এত প্রিয়, তা আগে বোঝা যায়নি। ১৯৫২ সালে বাংলার জন্য যখন আমরা জীবন দিলাম, তখন আমরা বুঝতে পারলাম বাঙালি সংস্কৃতি আমাদের মননের কত গভীরে প্রোথিত ছিল।

নবনীতা চৌধুরী: পাকিস্তান আমলে সবার জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে প্রতিজ্ঞা, সেটা কি সমাজের সর্বস্তরের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে এসেছিল, নাকি জনমানসের প্রতিফলনের ফলে এটা সর্বজনের দাবি হয়ে উঠেছিল?

আনিসুজ্জামান : আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা নেতাদের কাছ থেকে এসেছে। তারা জনমতকে তাদের অনুকূলে আনতে পেরেছেন। একবার জনমত যখন তাদের অনুকূলে এলো, তখন তা তৃণমূলে পৌঁছে গেল। কাজেই এটা নিচে থেকে এসেছে, তা কিন্তু নয়; বরং ওপর থেকে নিচে গিয়েছে। কিন্তু নিচে এমনভাবে ছড়িয়েছে যে ওপরের কথাটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। এটা আমাদের নেতাদের গৌরব যে, পাকিস্তান আন্দোলন যে ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্য দিয়ে হয়েছে, তাকে বাদ দিয়ে তারা একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। যে রাষ্ট্রটা কিন্তু ধর্মভিত্তিক হবে না। এটা কিন্তু জনপ্রিয় বক্তব্য ছিল না। তারা সাহস করে কথাটা বলেছেন, মানুষকে বোঝাতে পেরেছেন এবং মানুষকে সঙ্গে নিতে পেরেছেন।

নবনীতা চৌধুরী : আমাদের নেতারা এই সাফল্য অর্জন করলেও স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমাদের মনে কেন ভয় জাগে যে আমরা প্রগতির পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছি কি না কিংবা জনপ্রিয় শব্দবন্ধন ব্যবহৃত হয় যে আমরা ‘উল্টোপথে হাঁটছি’ কি না? এই যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর ভরসা না রাখতে পারা, এটা আরোপিত কি না? এই যে ভয় টিকিয়ে রাখা, এটাও একটা রাজনীতি কি না?

আনিসুজ্জামান : না, এই ভয়টা বাস্তব। ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচিত হলো, তার একটা মূলনীতিধর্মনিরেপক্ষতা। এ ছাড়া গণতন্ত্র আছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আছে, সমাজতন্ত্র আছে। এই ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি আমরা কয়দিন রাখতে পারলাম! বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তো এই নীতি বদলে গেল। তখন যারা

পাকিস্তান আমলে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতেন, তারা পুনর্বাসিত হলেন। এটা একটা বড় ক্ষতি। তারা অনেক বছর ধর্ম নিয়ে কথা বলতে পেরেছেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর জোর দিতে পেরেছেন। তারা বাংলাদেশের শুরুতেই এটা করেছেন। তারা হয়তো জনসভা করে করেননি, কিন্তু ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে করেছেন, ওরসের মাধ্যমে করেছেন। তারা একটি প্রচারণা বাংলাদেশ শুরু হওয়ার পর থেকেই চালিয়ে আসছেন। ১৯৭৫-এর পর কিন্তু তারা একটা বড় জায়গা পেয়েছেন। তার পরিণামে কিন্তু আমরা দেখছি যে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ফিরে এসেছে। সেই রামুর ঘটনা থেকে ব্রাক্ষণবাড়িয়া পর্যন্ত আমরা যদি শেষ পাঁচ বছরের ঘটনাও দেখি, তাহলেও দেখব যে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন ফিরে এসেছে।

নবনীতা চৌধুরী : তার মানে, আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজন আছে। তাহলে রাজনীতিতে আদর্শ না প্রতিষ্ঠিত হলে, সেটা কি সমাজ ও মননে প্রতিষ্ঠিত হয়? সুশাসন না থাকলে কি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা পায়?

আনিসুজ্জামান : সুশাসনের কথাটা পরে ধরি। আসলে রাজনীতিটা ছড়ায় তো রাজনীতিবিদদের মধ্য দিয়ে, রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্য দিয়ে। রাজনীতিবিদদেরই চিন্তা করতে হবে, কীভাবে তারা জনগণের মধ্যে যাবেন। যেমন আমি বলেছিলাম, যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র ব্যর্থ হলো, তখন আমাদের নেতারা সবার কাছে গেলেন, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের কথা বললেন। এটা টিকিয়ে রাখতে হয়। আমাদের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, আমাদের রাজনীতিতে আদর্শের অংশটা, মূল্যবোধের অংশটা কমে গেছে। এটা ক্রমশ ভোটের রাজনীতির দিকে চলে যাচ্ছে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছি ঠিকই, বঙ্গবন্ধুর কথা বলছি, কিন্তু মানুষকে এ আদর্শে উদ্বুদ্ধ করার কোনো চেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর নেই।

নবনীতা চৌধুরী : এই যে টিকিয়ে রাখার রাজনীতি কেন করতে হবে? অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে, প্রায় একই রকম দেখতে মানুষের দেশে কেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করে যেতে হবে?

আনিসুজ্জামান : এটি টিকিয়ে রাখতে হবে এই জন্য যে, প্রতি বছরই আমরা তরুণ বা কিশোরের সংখ্যা বৃদ্ধি দেখতে পাই। তাদের কাছে নতুন করে কথাটা পৌঁছাতে হবে। তাদের বাবা-মা হয়তো শুনেছেন, কিন্তু বাবা-মায়ের কাছ থেকে তারা যে সব সময় পায়, তা কিন্তু নয়। তাদের বোঝাতে হবে, এটা আমাদের আদর্শ, এটা আমাদের লক্ষ্য, এটা ভালো জিনিস, এর পক্ষে আমাদের দাঁড়াতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা মানে তো পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, ভেদ সৃষ্টি করা। কারণ পাকিস্তানে তো এটাই ছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্র। কিন্তু আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে এসে সবার রাষ্ট্র চেয়েছি। এখন আমরা যদি বলি সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্র চাই, সংখ্যালঘুদের বাদ দিয়ে, সে আদিবাসী হোক আর হিন্দু বা বৌদ্ধ হোক, তাহলে তো ওখান থেকে সরে যাওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ যে কারণে হয়েছিল, সেটা আর কার্যকর থাকছে না। বাংলাদেশ শুধু একটা স্বাধীন ভূখ- নয়, এর একটা আদর্শিক ভিত্তি রয়েছে। এটা না থাকলে ভূখ- থাকে, জাতীয় পতাকা থাকে, কিন্তু মজ্জাগত ব্যাপারটি আর থাকে না।

নবনীতা চৌধুরী : এখন যারা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা বলেন, যার বলে বলীয়ান হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আমরা এই ভূখণ্ডে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করলাম, সেই রাজনীতি যারা করেন, তারা যদি সুশাসন না দেন, তাহলে জনমানসে কেন পার্থক্য হবে?

আনিসুজ্জামান : ঠিকই তোমার কথাটা। এ জন্য মূল্যবোধটা ছড়িয়ে দিতে হয়। আর সুশাসন যেটা, সেটার তো কয়েকটি রাজনৈতিক ভিত্তি আছে। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভিত্তিও আছে। সেটার ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থা কী, যদি তা সংক্ষেপে বলি : আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। প্রায় ৫০ বছর অতিক্রম করলেও জাতীয় সংসদ আমাদের কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। এখনো দেখা যাচ্ছে, আমরা সংসদের চেয়ে সংসদের বাইরে বেশি কথা বলি। এখানে আমাদের দুর্বলতা আছে। আমাদের বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, আমাদের সংবাদপত্র, আমাদের শিক্ষকরা, অর্থাৎ নানা ক্ষেত্রের মধ্যে একটা ক্ষেত্র যদি দুর্বল থাকে, তাহলে দেখিয়ে দেওয়া যায়, এটার দুর্বলতা আছে। যদি বিচার বিভাগ ভুল করে, তাহলে আইন বিভাগ দেখিয়ে দেবে যে তাদের ভুল আছে। তার অর্থ, এদের মধ্যে একটা পারস্পরিক যোগসূত্র আছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। এটার অভাব রয়েছে। আর এই অভাবের ফলে আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে।

নবনীতা চৌধুরী : এসব প্রতিষ্ঠানকে কুশাসন চালিয়ে রাখার জন্য দাঁড়াতে দেওয়া হয় না, সেই অভিযোগও তো আছে।

আনিসুজ্জামান : আমি যেটা বলতে চেয়েছি, গণতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। এটা আমাদের গণতন্ত্রের একটা দুর্বলতা। দ্বিতীয় যে কথাটা রয়েছে, সেটা হলো আমাদের সহনশীলতার অভাব রয়েছে। আমরা মোটেই পরমতসহিষ্ণু নই। এগুলো পাকিস্তান আমল থেকে এসেছে, আমাদের দেশে সামরিক শাসনের সময় যেসব স্বৈরাচারী শাসক এসেছে, তাদের কাছ থেকে এসেছে। যে বৈশিষ্ট্যগুলো গণতন্ত্রে থাকার কথা নয়, সেগুলো আমরা ঝেড়ে ফেলতে পারিনি। ফলে আমরা কথায় কথায় পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করেছি। মিথ্যা অভিযোগ করেছি। এগুলো গণতন্ত্রের জন্য ভালো না। যদি বলি, সংসদ বর্জন ঠিক নয়, তাহলে বলা হবে, আগে তো করা হয়েছে। এটা যে অসুবিধা সৃষ্টি করছে, এটা বোঝানো যাচ্ছে না। যে দলই ক্ষমতায় থেকেছে, অন্য দলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনেছে। আমরা দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু সেটা করলেই যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা, সেটা তো নয়। সরকার বিরোধিতা এক জিনিস আর রাষ্ট্র বিরোধিতা আরেক জিনিস। এটার মধ্যে আমরা তফাত করছি না। আরেকটি জিনিস, আমাদের জনগণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হয়েছে। আমরা যে একসময় বলতাম, বাঙালি শান্তিপ্রিয়, সংস্কৃতিপ্রিয়, সেটার একটা ঘাটতি হয়েছে। আমাদের মধ্যে যে সংঘাত তাতে মনে হয় আমরা যে শান্তিপ্রিয় জাতি, সেই অভিধাটি বাতিল করে দিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত