মামলা-গ্রেপ্তারেও থামছে না প্রতারণা

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:২৩ এএম

নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেকেই বিভিন্ন ব্যবসার আড়ালে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) চালিয়ে যাচ্ছেন। ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগিয়ে গ্রাহক টানছেন তারা। স্বল্পসময় ও অল্পপুঁজি বিনিয়োগে মোটা অঙ্কের লাভের আশায় এসব প্রতিষ্ঠানে হু হু করে বাড়ে গ্রাহক। একটা পর্যায়ে আমানত ফেরত নিয়ে অভিযোগ আসার পর প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে গা ঢাকা দেন মালিক। তখন কমিশনের আশায় গ্রাহক সংগ্রহকারীরা বিপাকে পড়েন। এভাবেই এমএলএম ব্যবসার নামে লাখো মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে প্রতারকরা।

মামলা ও গ্রেপ্তারের পরও এ ব্যবসা থামানো যাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকের মামলার পর অনেক এমএলএম প্রতিষ্ঠানের মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তারা সহজেই জামিন পেয়ে যান। কিন্তু ভুক্তভোগী গ্রাহক তার টাকা ফিরে পান না। সর্বশেষ ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. রাগীব আহসান (৪১)।

সম্প্রতি পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগে এমন চিত্র উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, টাকা ফিরে পেতে হলে ভুক্তভোগীকে মামলা করতে হবে। আদালতের মাধ্যমে তারা টাকা ফিরে পেতে পারবেন। তবে অনেকেই মামলার ঝামেলায় জড়াতে চাচ্ছেন না।

একটি এমএলএম প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭০ হাজার টাকা খুইছেন পিরোজপুরের মৌসুমী বেগম। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক কষ্টে জমানো টাকা মেরে দিছে। টাকা পাওয়ার জন্য মামলা করলে আরও খরচ হবে। এরপর টাকা পাব তার নিশ্চয়তা কী?’

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্যান্য ব্যবসার আড়ালে নির্বিঘেœ চলছে এমএলএম। কেবল প্রতারিত হওয়ার পরই প্রকাশ্যে আসেন ভুক্তভোগীরা। এখানে অল্প সময়ে অস্বাভাবিক লাভের আশায় এসে নিঃস্ব হচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। প্রতারকরা গ্রাহকের টাকা দিয়ে নিজের নামে অঢেল সম্পদ করছেন। অনেকে টাকা বিদেশেও পাচার করছেন এবং সুযোগ বুঝে নিজে উড়াল দিচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এমএলএম ব্যবসা পরিচালনাকারী অনেকে র‌্যাবের নজরদারিতে রয়েছেন। ভুক্তভোগীরা আমাদের কাছে অভিযোগ করছেন। এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাধারণ প্রতারণা মামলা হয়। এক এবং এক হাজার কোটি টাকা প্রতারণার মামলা কিন্তু একই। এগুলো সহজেই জামিনযোগ্য এবং শাস্তিও খুব একটা বেশি না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ই-কমার্সের আড়ালে পিরামিড আকৃতির নিষিদ্ধ অনলাইনভিত্তিক মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পরিচালনার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। এরপর গত বছরের ২৬ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও সিইও আলামিন প্রধানসহ (৩২) ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় তাদের অ্যাপস। পরে ডিবি জানায়, প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকের ২৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এসপিসি।

মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক এই এমএলএম ব্যবসা বাংলাদেশসহ অন্তত ১৭টি দেশে পরিচালিত হওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এখানে রেজিস্ট্রেশন ফি পরিশোধ করা হতো বিকাশ, নগদ ও রকেট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। স্বল্পসময়ে অধিক কমিশনের লোভ দেখিয়ে মাত্র ১০ মাসে ২২ লাখ সদস্য সংগ্রহ ও তাদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ এ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

ওই সময় রাজধানীর কলাবাগান থানা এলাকায় এফ হক টাওয়ারে এসপিসির কার্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। তবে কিছুদিনের মধ্যে আলামিন প্রধান জামিনে মুক্তি পান। ফের অ্যাপস চালু হয় এবং আগের কার্যালয়েই এখন পুরোদমে চলছে কার্যক্রম।

গতকাল এফ হক টাওয়ারের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মো. মারুফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিবি কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর অফিস বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক মাস পর চালু হয়। এখন পুরোদমে চলছে সব। শত শত মানুষ প্রতিদিন ভিড় করছেন।’

এসপিসির বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা জামিনে আছেন। মানি লন্ডারিং মামলার বিষয়টি সিআইডিকে জানানো হয়েছে। তারা মামলা করবে। অভিযোগপত্রের জন্য আমরা সবকিছু প্রস্তুত করেছি। কিন্তু এসপিসি উচ্চ আদালতে রিভিশন দিয়েছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে শুনানি বন্ধ ছিল। তবে আমরা যাদের গ্রেপ্তার করেছিলাম তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, এমএলএম অংশ বাদ দিয়ে এসপিসি ই-কমার্স করতে চাচ্ছে। মামলা তদন্তাধীন থাকায় আমরা তাদের ব্যবসা বন্ধের জন্য বলতে পারছি না। ই-কমার্সের লাইসেন্স বাতিল হবে কি না, সিদ্ধান্ত আদালত দেবে। প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণিত হলে আদালত লাইসেন্স বাতিল করবে।’

ভুক্তভোগীরা কীভাবে টাকা ফেরত পাবেন জানতে চাইলে এই এডিসি বলেন, ‘টাকা ফেরতের জন্য অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিতে হবে। মামলা করলে আদালতের মাধ্যমে ভুক্তভাগীরা টাকা পেতে পারেন।’

এসপিসি ছাড়াও গত ১৭ মার্চ মাশরুম পণ্য বিক্রির আড়ালে এমএলএমের নামে প্রতারণার অভিযোগে নিওলাইফ গ্লোবাল প্রাইভেট লিমিটেডের এমডিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। ভুক্তভোগী এক নারীর অভিযোগে রাজধানীর মালিবাগ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বশেষ এমএলএমের নামে ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীতে এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. রাগীব আহসানকে (৪১) তার সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। নামসর্বস্ব ১৭টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের নামে-বেনামে সম্পত্তি করেছেন রাগীব। তার বিরুদ্ধে গতকাল পিরোজপুর থানায় তিনটি মামলা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত