নদী প্রবাহ, খাল-বিল, জলাশয় ভরাট করে কোনো স্থাপনা বা শিল্প না করার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এ নির্দেশনার উল্টো পথে হাঁটছেন সরকারি কর্মকর্তারা। যশোরের ভবদহ বিলের একটি অংশ ধলার বিল। প্রায় পুরোটাই ব্যক্তি মালিকানায় থাকা এ বিলে মাছ চাষ করেন স্থানীয় লোকজন। স্থানীয় বাজারের মাছের বড় উৎসও এ বিল। কিন্তু না মানা হচ্ছে পরিবেশের আইন, না মানা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা। যেখানে যুগের পর যুগ মানুষ মাছ চাষ করে আসছেন, এমন একটি বিলেই তৈরি হতে যাচ্ছে যশোর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেড।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) প্রস্তাবিত ১ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকার যশোর ইপিজেড প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উত্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। অনুমোদন হলে এটি হবে দেশের দশম ইপিজেড।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধলার বিলে কোথাও কোথাও প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীরতা রয়েছে। ইপিজেড বাস্তবায়ন করতে হলে এ গভীর জলাশয় ভরাট করেই করতে হবে। জলাশয় ভরাট হলে পরিবেশের ক্ষতি হবে কি না, তা তারা বেপজার কাছে জানতে চেয়েছেন। জবাবে বেপজা জানিয়েছে, ইপিজেড হলে পরিবেশের ক্ষতি হবে না। বরং ইপিজেড স্থাপনের পর একটি খাল করে দেওয়া হবে, যাতে ভৈরব নদে ইপিজেডের পানি প্রবাহিত হতে পারে।
পরিবেশের বিষয়টি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) নজর এড়িয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আবদুল বাকি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। বেপজাও আমাদের পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়গুলো জানিয়েছে। সবকিছু পর্যালোচনা করেই প্রকল্পটি একনেকের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।’
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন বা জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী যেকোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ। জলাধার আইন লঙ্ঘন করলে পাঁচ বছরের কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। শাস্তির পাশাপাশি আইন অমান্যকারীর নিজ খরচে সেটা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার মতো কঠোর বিধানও রয়েছে আইনে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রস্তাবিত যশোর ইপিজেড স্থাপনের জন্য অভয়নগরের প্রেমবাগ ইউনিয়নের ধলার বিলে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ইউনিয়নের মাগুরা, রাজাপুর, প্রেমবাগ, চেঙ্গুটিয়া, আরাজি বাহিরঘাট, বালিয়াডাঙ্গা, মহাকাল ও আমডাঙ্গা মৌজার ৫০৩ একর বা ১৫ হাজার বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হবে।
যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার তথ্যমতে, ইপিজেডের জন্য নির্ধারিত স্থানের অধিকাংশ জমিই ব্যক্তি মালিকানার। এর মধ্যে মাত্র দুই একর খাসজমি।
এ প্রকল্পের ১ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকার মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা, বেপজার নিজস্ব অর্থায়ন ৩৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে ২ শতাংশ সুদে সরকারি তহবিল থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে। ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর বেপজার গভর্নর বোর্ডের সভায় যশোর ইপিজেড করার সিদ্ধান্ত হয়। ইপিজেডটি ভবদহ এলাকা অথবা কেশবপুর, শার্শা, মনিরামপুর, অভয়নগর উপজেলার নদী তীরবর্তী ভূমি বা অন্য কোনো সুবিধাজনক স্থানে করার সিদ্ধান্ত হয় সভায়।
জলাশয় বা বিলকেই কেন শিল্প স্থাপনের জন্য নির্ধারণ করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন কী সমস্য হচ্ছে সেটা বড় করে না দেখে ৫০ বছর পর আমাদের কী দরকার তা বিবেচনায় নিয়ে ইপিজেড করা হচ্ছে আর পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে।’
প্রস্তাব অনুযায়ী, যশোরের ধলার বিলে প্রায় ৫৬৫ একর জমির ওপর এ ইপিজেড স্থাপনের প্রস্তাব করেছে বেপজা। এতে প্রত্যক্ষ্যভাবে ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে, পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে আরও তিন লাখ মানুষ। এতে ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছে প্রস্তাবকারী সংস্থা। এতে বছরে আরও ২৪০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় সম্ভব বলে মনে করছে বেপজা।
এতে আপত্তি রয়েছে স্থানীয় পরিবেশ আন্দোলনকারীদের। তারা বলছেন, ভবদহ নিয়ে সংকট সেই ষাটের দশক থেকে। এরপর থেকে জলাবদ্ধতা সেখানকার স্থানীয় মানুষের নিত্যসঙ্গী। জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান না করে আবার নিয়ে আসা হয়েছে ইপিজেড করার পরিকল্পনা। এতে সংকট বাড়বে না কমবে, তা তারা বুঝতে পারছেন না। সরকারের কোনো সংস্থা তা বোঝাতেও আসছে না। আগের খালগুলোই চলছে অব্যবস্থাপনায়। ভৈরব নদের পানি দূষিত হচ্ছে স্থানীয় কলকারখানার বর্জ্য।ে ইপিজেডের বর্জ্য এ দূষণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
ইপিজেড এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যে স্থানে ইপিজেড নির্মাণ করা হবে সেই বিলের পানি নিষ্কাশন হয় স্থানীয় আমডাঙ্গা খাল হয়ে ভৈরব নদে। এমনিতেই অভয়নগরের নওয়াপাড়ার বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্যে দূষিত হয়ে আছে ভৈরব নদের পানি। পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় ওই কলকারখানাগুলোকে জরিমানা করলেও কোনো প্রতিকার হয়নি। ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পর সেখানে স্থাপিত কলকারখানার বর্জ্য মিশ্রিত পানি একই স্থানে গিয়ে পড়বে। এ কারণে ইপিজেডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেমন হবে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। বর্জ্যরে সুব্যবস্থাপনা না হলে মারাত্মক ক্ষতি হবে এলাকার। এ কারণে আমডাঙ্গা খাল দখলমুক্ত রাখতে হবে, সরাসরি খালে বর্জ্য ফেলা যাবে না এবং খালের দুই পাশে পর্যাপ্ত গাছ লাগাতে হবে।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মফিজ উদ্দীন জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয় নিয়ে ইপিজেডের প্রকল্প প্রণয়নকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। তাকে জানানো হয়েছে, ইপিজেডে বর্জ্য শোধনাগার হবে। সরাসরি খালে বর্জ্য ফেলা হবে না।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৭৩ লাখ ৭৮ হাজার ৩৯১ ঘন মিটার ভূমি উন্নয়ন করতে হবে। ভূমি উন্নয়ন করে ৪৩৮টি প্লট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পানি প্রবাহের জন্য ৯৭৬ মিটারের খাল খননের চিন্তাও রয়েছে বেপজার। কর্মসংস্থানের মধ্যে ৬০ শতংশের বেশি থাকবে নারী শ্রমিক।
গত ডিসেম্বরে একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্প করেন; কিন্তু প্রকৃতি ও পরিবেশের কোনো প্রকার ক্ষতি করে উন্নয়নকাজ নয়। কোনোমতেই পরিবেশকে ডিস্টার্ব করা যাবে না।’
সম্প্রতি পরিবেশের তোয়াক্কা না করেই প্রকল্প প্রস্তাবের প্রবণতা বেড়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে। মানা হচ্ছে না প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও। ইতিমধ্যে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেটিও করা হচ্ছে জলাশয়ের মধ্যেই। প্রস্তাবিত তৃতীয় সাফারি পার্ক হবে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। সেটিও বন কেটে। হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এটিও হাওরের মধ্যে।
জলাশয় ভরাট করলে জীববৈচিত্র্যের কী ধরনের ক্ষতি হয় এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৃথিবী দিনে দিনে শুষ্কতার দিকে যাচ্ছে। সেখানে ভূ-গর্ভস্থ পানির যে জায়গা, তার ব্যত্যয় ঘটবে। জীববৈচিত্র্য বিশেষ করে সেখানকার পোকামাকড়, পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর জায়গা থাকবে না। অবশ্যই এখানে জীববৈচিত্র্যের ব্যত্যয় ঘটবে এখানে। এটার ব্যত্যয় ঘটা মানে আমাদের প্রাণ ও প্রকৃতির ওপর আঘাত আসা। যেটি হয়তো আমরা এখন খালি চোখে দেখতে পারি না। এটার প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে আসবে।’
জলাশয় ভরাট করে পুঁজিপতিদের স্বার্থে ইপিজেড করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, জলাধার সংরক্ষণ যে আইন আছে, সে আইনে বলা আছে, কখনোই খাল-বিল-পুকুর-জলাশয়ের যে চরিত্র আছে, তার ব্যাঘাত ঘটানো যাবে না।
আলমগীর কবির বলেন, ‘আমাদের নদী, পুকুর, জলাশয় দখল করতে করতে এমন অবস্থা হয়েছে যে, জীববৈচিত্র্য শূন্যের কোটায় চলে এসেছে।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত বেপজা ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের সব ইপিজেড পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এ সংস্থা। বর্তমানে দেশে নয়টি ইপিজেড রয়েছে। ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রামে স্থাপিত হয় দেশের প্রথম ইপিজেড। পরবর্তী তিন দশকের মধ্যে পর্যায়ক্রমে স্থাপিত হয় বাকিগুলো।