যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। ২০২৫ সালে দেশটিতে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের (সিইও) বেতন সাধারণ কর্মচারীদের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। মার্কিন শ্রম সংগঠনগুলোর জোট ‘এএফএল-সিআইও’-র সাম্প্রতিক ‘পেওয়াচ’ বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সিইওরা তাদের সাধারণ কর্মীদের গড় বেতনের চেয়ে ৩১২ গুণ বেশি আয় করেছেন, যা ২০২৪ সালে ছিল ২৮৫ গুণ। তবে টেসলা প্রধান ইলন মাস্কের রেকর্ড আয়ের হিসেব যুক্ত করলে সিইওদের গড় আয় সাধারণ কর্মচারীদের চেয়ে আরও হাজার গুণ বেশি দাঁড়ায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইলন মাস্কের বিপুল অঙ্কের আয় সাধারণ হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালে ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার সিইও হিসেবে মাস্ক আয় করেছেন ১৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। এই আয় টেসলার একজন সাধারণ কর্মীর গড় আয়ের তুলনায় প্রায় ২৫ লাখ গুণ বেশি। এমনকি টেসলার বার্ষিক মোট রাজস্ব (৯ হাজার ৪০০ কোটি ডলার)-কেও ছাড়িয়ে গেছে তার এই আয়।
অথচ একই বছরে কোম্পানিটির আয় ৩ শতাংশ এবং বিক্রি ৯ শতাংশ কমেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনে মাস্কের অংশ নেওয়ার কারণে অনেক গ্রাহকই টেসলার পণ্য বয়কট করেছিলেন। একই সাথে কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার গাড়ি বাজার থেকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৫ সালের প্রথম অর্ধে মাস্ক ট্রাম্প প্রশাসনের সরকারি ব্যয় ও কর্মীবাহিনী ছাঁটাই সংক্রান্ত দপ্তর ‘ডোজ’-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ এবং মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স-এর মালিকানাও রয়েছে তার হাতে। একই বছরের জুনে স্পেসএক্সের আইপিও আসার পর ক্ষণিকের জন্য বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ বা লাখ কোটি ডলারের মালিক হিসেবে তালিকাভুক্ত হন মাস্ক।
মাস্ককে অন্তর্ভুক্ত করলে গত বছর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ প্রতিষ্ঠানের সিইওদের গড় আয় ১ হাজার ৭০০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৩১০ কোটি ডলারে। আর মাস্ককে বাদ দিলে এই বৃদ্ধির হার ছিল ২১ শতাংশ (গড় আয় ২ কোটি ২৮ লাখ ডলার), যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
সবচেয়ে বড় বেতনের ব্যবধান দেখা গেছে উৎপাদন খাতে। এই খাতে সিইওদের গড় আয় প্রায় ৬৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যেখানে সাধারণ কর্মীর আয় সাড়ে ৯৩ হাজার ডলারের কিছু বেশি—যা ১১ হাজার শতাংশেরও বেশি ব্যবধান নির্দেশ করে। এ ক্ষেত্রেও টেসলার প্রভাব বেশি।
ব্যবধানের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শিল্প, বিনোদন ও বিনোদন খাত (আর্টস, এন্টারটেইনমেন্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন)। সেখানে সিইওরা গড়ে ২ কোটি ৪৬ লাখ ডলার আয় করলেও সাধারণ কর্মীদের আয় মাত্র ২৫ হাজার ডলার (ব্যবধান ১,০৫৭ : ১)।
কফি শপ চেইন স্টারবাকস-এ এই বৈষম্য ছিল আরও প্রকট। সেখানে সাধারণ কর্মীর বার্ষিক আয় ছিল ১৭ হাজার ২৭৯ ডলার (যা দেশটির দারিদ্র্যসীমার মাত্র ১,৬২৯ ডলার ওপরে)। বিপরীতে সিইও ব্রায়ান নিকোলের আয় ৩ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এই অনুপাত দাঁড়ায় ১,৭৯৪ : ১-এ।
প্রতিবেদনটিতে আরও জানা যায়, আমাজন, ডলার ট্রাই, ফেডেক্স, ম্যাকডোনাল্ডস এবং ওয়ালমার্টের কর্মীরাই যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির সবচেয়ে বড় গ্রহীতা। আমাজনের সিইও অ্যান্ডি জ্যাসি সাধারণ কর্মীর চেয়ে ৫১ গুণ এবং ম্যাকডোনাল্ডসের সিইও ক্রিস কেম্পচিনস্কি ১,০৮২ গুণ বেশি আয় করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরের আয় নিয়েও রিপোর্টটিতে তথ্য দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ট্রাম্পের আয় ২৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এই আয়ের সিংহভাগই এসেছে ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ এবং মেমে কয়েন বিক্রি থেকে।
তার এই আয় যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাধারণ কর্মীর বার্ষিক আয়ের প্রায় ৪৩ হাজার ১৫৪ গুণ। নীতি নির্ধারণ বা প্রেসিডেন্সির প্রভাব খাটিয়ে নিজের ব্যবসা ও ক্রিপ্টো খাত সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে নিন্দুকদের সমালোচনার মুখেই ট্রাম্পের এই আয় বৃদ্ধি পেল।
এএফএল-সিআইও সতর্ক করে বলেছে, সিইওদের নিজেদের পকেট ভরানোর এই মানসিকতা কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও সার্বিক অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
মিশিগান ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাহকদের আত্মবিশ্বাস ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কর্মসংস্থানও নিম্নমুখী; শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে জুলাইয়ে ২৩,০০০ চাকরি হারিয়েছে অর্থনৈতিক খাত। কনফারেন্স বোর্ডের জরিপ বলছে, দেশটির অর্থনীতি নিয়ে জনগণের আস্থা টানা তিন মাস ধরে কমছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ৪০০ ডলারের আকস্মিক জরুরি খরচ বহন করতে সক্ষম নন।
সূত্র: আলজাজিরা
নতুন ইতিহাস গড়লেন ইলন মাস্ক
নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন পেলেন ইলন মাস্ক