টাকা সিন্ডিকেটের পকেটে

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:৫৫ এএম

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক উত্তরা পূর্ব জোনের আওতাধীন ১১ নম্বর চৌরাস্তা ট্রাফিক পুলিশ বক্স। ওপরে লাগানো স্টিকারের বড় বড় হরফে লেখা, ‘বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া দেয়া হবে’। যা দেখে হাসাহাসি করছিলেন দুই বন্ধু। এ সময় তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন বলে ওঠেন, ‘দেখেন ট্রাফিক পুলিশের কাজকর্ম! একদিকে সড়ক দখল করেছে, অন্যদিকে পুলিশ বক্সটি বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া দিতে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। প্রত্যেকটা ট্রাফিক পুলিশ বক্সের একই অবস্থা। দেখে মনেই হবে না এগুলো ট্রাফিক পুলিশ বক্স বা এখানে কোনো কর্মকর্তার অফিস।’ এ চিত্র গত সোমবারের।

সেখানে ফুটপাতে ট্রাফিক পুলিশ বক্স নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন মো. ইমরান হোসেন সামির। পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও এমন ট্রাফিক পুলিশ বক্স দেখিনি, যেখানে বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। এমন বিজ্ঞাপন দেখে আমি নিজেও অবাক হয়েছি। ব্যবসার কাজে বিভিন্ন দেশে যেতে হয়। সড়কে ট্রাফিক পুলিশ বক্স দেখা তো দূরের কথা, ট্রাফিক পুলিশ দেখাও অনেক ভাগ্যের বিষয়। আর যারা বিদেশ থেকে আমাদের এই দেশে ঘুরতে আসে, তারা যখন ফুটপাতে ট্রাফিক পুলিশ বক্স দেখে তখন এই দেশের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?’

রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত দেখভালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। সংস্থাটির রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আইনের তোয়াক্কা না করে রাজধানী জুড়ে পুলিশ ইচ্ছেমতো বুথ বা বক্স নির্মাণ করে যাচ্ছে। এতে ফুটপাত দখল ও শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব বুথে বা বক্সে টাকার বিনিময়ে কারা বিজ্ঞাপন দেয়, সেই অর্থ কোথায় যায়, তাও তাদের জানা নেই। ডিএমপি পুলিশ বক্স তৈরির নামে যে বিজ্ঞাপনবাণিজ্য করছে, তার যথেষ্ট প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। কিন্তু অবৈধ হলেও সিটি করপোরেশন এসব বুথ উচ্ছেদ করতে পারছে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরা চৌরাস্তা ট্রাফিক পুলিশ বক্সের চারপাশে বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া দেওয়ার স্টিকার লাগানো রয়েছে। সেখানে একটি মোবাইল ফোন নাম্বার দেওয়া আছে। পরিচয় গোপন রেখে বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া নিতে চান জানিয়ে এ প্রতিবেদক কল করেন ওই নাম্বারে। কলটি রিসিভ করেন মো. ফারুক হোসেন নামে এক ব্যক্তি। বিজ্ঞাপনের কাজে এক বছর ব্যবহারের জন্য ৩ লাখ টাকায় বক্সটি ভাড়া দিতে চান বলে জানান তিনি। তার দাবি, তিনিই মূলত বক্সটির মালিক। এ ছাড়াও ট্রাফিক উত্তর ডিভিশনে তার একাধিক ট্রাফিক বক্স রয়েছে বলে জানান। ফারুক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, চাইলেই তিনি যেখানে সেখানে ট্রাফিক বক্স বসাতে পারেন। কিন্তু বক্সটি বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া নিলে পরে সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ করে দেবে কি না জানতে চাইলে হেসে উঠে তিনি বলেন, ‘সাত বছর ধরে এ বক্সটি বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশন কখনো দেখেছেন ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভেঙে দেয়?’ ফারুকের দাবি, সিটি করপোরেশন থেকে সব বক্সের অনুমোদন নিয়েছেন। কিন্তু তার কোম্পানির নাম জানতে চাইলে তিনি তা বলতে রাজি হননি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ১১ নম্বর চৌরাস্তা ট্রাফিক পুলিশ বক্সের ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই) পান্নু মিয়া জানান, মাত্র কয়েক দিন হয়েছে তিনি ওই বক্সের দায়িত্ব নিয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। অন্যদিকে ট্রাফিক উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সৌন্দর্য নষ্ট করে ট্রাফিক বক্স থেকে এমন বিজ্ঞাপনগুলো অপসারণ করতে বলেছি। এ ছাড়া যারা বক্সগুলোতে বিজ্ঞাপন বাণিজ্য করে সেগুলো অপসারণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞাপনের কারণে ট্রাফিক বক্সগুলো যেন বিতর্কিত না হয় সেদিকে লক্ষ

রাখা হচ্ছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের চারটি ডিভিশনে তিনশোর বেশি ট্রাফিক বুথ বা বক্স রয়েছে। ৮ থেকে ১০ জনের একটি চক্র যার অধিকাংশ তৈরি করে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন কোম্পানি কাছে বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহারের জন্য ভাড়া দিচ্ছে। আর এসব বক্সে লাগানো বিজ্ঞাপন বাবদ কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না ডিএনসিসি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে করে কম করে হলেও বছরে অর্ধকোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ডিএনসিসি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সড়কে ও ফুটপাতে অবৈধ ট্রাফিক পুলিশ বক্স তৈরি করে লাখ লাখ টাকা আয় করা চক্রটির অন্যতম সদস্যরা হলেনÑ মোহাম্মদ ফারুক, মো. বিল্লাল, মো. হানিফ, মো. শফিক, মো. হামিম, মো. রেজাউল ও হ্যানা। তাদের অধিকাংশই একসময় বিভিন্ন ওয়ার্কশপে বিলবোর্ড বানানোর কাজ করতেন। কেউ আবার বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। কাজের পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এখন তারা উত্তর সিটির অধিকাংশ ট্রাফিক পুলিশ বক্সের মালিক। বছরে লাখ লাখ টাকা আয় তাদের।

এ বিষয় দেশ রূপান্তরের কথা হয় চক্রটির সদস্য মোহাম্মদ ফারুকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ছোটখাটো ব্যবসায়ী। পুলিশের কথায় এক-দুটি বক্স তৈরি করে বসাই। বিল্লাল ও হামিম উনারা অনেক বড় এবং পুরনো ব্যবসায়ী। এ বক্সের আয় দিয়ে আমার পরিবার চলে।’

পরে মো. বিল্লালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বেশ কিছু ট্রাফিক বক্স রয়েছে তার। যার অধিকাংশই বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এখনো ভাড়া হয়নি কামারপাড়া, সøুইসগেট, ধানমন্ডি, কলাবাগান, গুলশান ওয়ান্ডারল্যান্ড, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট ও দারুস সালাম মাজার রোডের বক্স। এ ছাড়া তিনি জানান, তার বন্ধু হামিমের একাধিক বক্স রয়েছে। যার মধ্যে বর্তমানে উত্তরা রাজলক্ষ্মীর বক্সটি বিজ্ঞাপনের জন্য ফাঁকা রয়েছে।

এসএস এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ কাকলী মোড়ের রেলক্রসিংয়ের সামনে কংক্রিটের স্থাপনার ট্রাফিক বক্স তৈরি করেছেন। বক্সটির ওপরে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা থাকায় এক বছর বিজ্ঞাপনের জন্য ৪ লাখ টাকা চান তিনি। সিটি করপোরেশনের অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাকলী বক্সে আমার একজন এসি সাহেব আছেন। বোঝেনই তো পুলিশের বক্স। এটা পুলিশের ব্যাপার, পুলিশ সব জানে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আ ন ম তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে এসব ট্রাফিক বক্সের কোনো অনুমোদন নেই। বক্সগুলো বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহার হচ্ছে, সেই বিজ্ঞাপন বাবদ কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না ডিএনসিসি। যা অর্ধকোটি টাকা হতে পারে। আপনার কথাগুলো নোট করে রেখেছি। প্রতি মাসে মেয়রের সভাপতিত্বে মাসিক রাজস্ব সভা হয়। এবারের সভায় এ বিষয়গুলো তুলে ধরব।’ তবে এসব অবৈধ বক্স ও বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত