ছাত্রলীগের কেন্দ্রের সাথে সংগঠনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। গত কয়েকমাস ধরে এটি শীতল থাকলেও এই দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। ছাত্রলীগের ঐতিহাসিক ছাত্র সমাবেশের পর থেকে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ কেন্দ্র ও ঢাবির শীর্ষনেতাদের। এ নিয়ে সংগঠনটির অভ্যন্তরে বড় ধরনের সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার শঙ্কা রয়েছে। যা আগামী নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের এই দ্বন্দ্বের কারণে কিছুটা উদ্ধার হওয়া ইমেজ আবারো হারাতে বসেছে ছাত্রলীগ। সংগঠনটির শীর্ষ চার নেতার দ্বন্দ্ব মেটাতে আলোচনার টেবিলে বসতে হতে পারে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের।
গত বছরের ২০ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দায়িত্ব পান সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। একইসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্ব পান মাজহারুল কবির শয়ন এবং তানভীর হাসান সৈকত। এরপর থেকেই মানসিক দূরত্ব তৈরি হয় ছাত্রলীগের শীর্ষ এই চারনেতার। হলে প্রভাব খাটানোকে কেন্দ্র করে বারবার মারামারিতে জড়ান তাদের অনুসারীরা। বহিষ্কার, পাল্টা বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্র সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ায় বেজায় চটেছেন ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়নের ব্যক্তিগত ভ্যারিফায়েড একাউন্ট থেকে একটি পোস্ট করলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার তৈরি করে। এরপর আরও প্রকাশ্যে আসে তাদের দ্বন্দ্ব। ঢাবি ছাত্রলীগ নেতাদের দাবি যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি তাদের প্রতি। অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সঙ্গে বসতেও রাজি নয় তারা। দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা না হলে কেন্দ্রীয় বলয়ের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র ইউনিট হিসেবে চলার ঘোষণা দিয়েছে ঢাবি ছাত্রলীগ।
নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমিটি গঠনের পর থেকেই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বেশ কয়েকটি কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ দেখা দেয় ঢাবি ছাত্রলীগে। ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতিকে কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দামের ম্যান বলে প্রচার করা, ছাত্রলীগের শোভাযাত্রার শাড়ি নিয়ে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের হাতাহাতিতে আহত সৈকতের অনুসারী তানিয়া আক্তার তাপসী আহত হওয়ার ঘটনায় বিচার না করা, রোকেয়া হলের একটি কক্ষ থেকে সৈকতের অনুসারী আয়েশা সিদ্দিকা রুপাকে মারধর করে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া, এছাড়া ফজলুল হক মুসলিম হলের কক্ষ দখলকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম ও সাধারণ সম্পাদক ইনানের অনুসারীদের সঙ্গে সৈকতের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় বহিষ্কৃত বেশির ভাগই সৈকতের অনুসারী বলে জানা যায়।
এসব ঘটনায় ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এদিকে সাত কলেজকে ঢাবি শাখার অধীনে নিয়ে আসার তৎপরতাকেও ভালো চোখে নেয়নি কেন্দ্রীয় কমিটি। কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মত তাদের। ছাত্রলীগের এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। গতকাল শনিবার ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে ফুল দিতে এসে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়নের অনুসারীদের হাতে হেনস্থার শিকার হন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। রমনার সাবেক এডিসি কর্তৃক ছাত্রলীগের দুই নেতাকে মারধরের ঘটনায়ও অনেকটা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে এই শীর্ষ চারনেতা।
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বহিষ্কার হন ছাত্রলীগের আগের কমিটির শোভন-রাব্বানি। এরপর দায়িত্বে আসেন জয়-লেখক। তাদের বিরুদ্ধে ‘বিবৃতি-নির্ভর কমিটি গঠন’, গঠনতন্ত্র না মানাসহ নানান অভিযোগ ওঠে। হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে দায়িত্ব দেওয়া হয় সাদ্দাম-ইনানকে। নানান ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সে দায়িত্ব ভালোভাবে সামলাচ্ছিলেনও তারা। তবে ছাত্রলীগের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে সেই ইমেজ আবারো হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের জন্যও যা নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। কেন্দ্র-ঢাবির দ্বন্দ্ব আখেরে সংগঠনই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা নিয়ে সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপ করেন কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে কিছুটা ছাড় দিলে সংগঠনের জন্যই উত্তম। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের সংঘাত হতে পারে ক্যাম্পাসে। ইতিবাচক ও স্মার্ট ছাত্রলীগের অন্তরায় হবে এসব ঘটনা। জাতীয় নির্বাচনের আর বেশি দিন নেই তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে শীর্ষ চারনেতার দ্বন্দ্বের অবসান হওয়া উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন বলেন, দেশরত্ন শেখ হাসিনার নির্দেশ আমরা যেন সবাই বড় মন নিয়ে রাজনীতি করি, উদার হয়ে কাজ করি। কাউকে বক্তব্য দিতে না দেওয়া, রাজনীতি চাপিয়ে রাখার অধিকার কারো নেই। প্রধানমন্ত্রীর সামনে বক্তব্য দিতে পারাটা রীতি অনুযায়ী আমাদের অধিকার। সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সমাবেশের ৫-৬ দিনই তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি। পরে ফোন দিয়ে আমাদের সঙ্গে বসতে চেয়েছে। কিন্তু এ ধরনের বসা অতীতেও হয়েছে কোনো সুরাহা হয়নি। আমরা পার্টির দায়িত্বশীল নেতাদের জানাব। তারপরও যদি সুরাহা না হয় আমরা স্বতন্ত্র ইউনিট হিসেবে চলব। আমরা আমাদের মতো, তারা তাদের মতো চলবে।
ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত বলেন, লেজুড়বৃত্তি টেকাতে গিয়ে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত আমাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের হৃৎপিণ্ড, কোনোভাবেই যেন এই হৃৎপিণ্ডে আঘাত না ঘটে। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল করে দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ দুর্বল হয়ে যাবে। তাই আমাদের আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত এবং যার যার প্রাপ্য সম্মান তাকে দেওয়া উচিত।
সার্বিক বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অনেক বড় একটি সংগঠন। আমাদের সব ইউনিটের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে। কারও হয়তো মান অভিমানের জায়গা থাকতে পারে। আমরা সেগুলো মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করবো। কারও সঙ্গে আমাদের কোনো দূরত্ব কিংবা মনোমালিন্য নেই। আমরা এক হয়ে কাজ করছি এবং করবো। সাত কলেজের কমিটি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ দীর্ঘদিন ধরে করছে। এ বিষয়ে আপাতত আমাদের পরিবর্তনের সুযোগ কিংবা অবকাশ নেই।