হারের ক্ষত নিয়ে বিশ্বকাপে

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:৫১ এএম

কোনো পথ্যেই সারছে না গোড়ার গোলমাল। বিশ্বকাপ যাত্রার আগের দিন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ বাঁচানোর ম্যাচে দুই তরুণকে দেওয়া হয়েছিল গোড়াপত্তনের দায়িত্ব। এশিয়া কাপে অভিষিক্ত তানজিদ হাসান তামিমের সঙ্গে মঙ্গলবার অভিষেক হয় জাকির হাসানের। এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অভিষেকে রানই পাননি তানজিদ তামিম। জাকিরের শুরুটাও হয়েছে দুঃস্বপ্নের। ফিরেছেন মাত্র ১ রান করে। পরের ওভারে তানজিদ তামিমও অনুসরণ করেন সূচনা সঙ্গীকে। তাতে ম্যাচটি জিতে ১-১-এ সিরিজ শেষের লক্ষ্যে শুরুতেই লাগে বড়সড় ধাক্কা। সেই ধাক্কা সামলাতে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত লড়েছেন একাই। এই লড়াইয়ে তার সঙ্গী হতে পারেননি সেভাবে কেউই। এক প্রান্ত আগলে রাখা শান্তর ব্যাট সাবলীল চললেও বাকিরা ব্যস্ত ছিলেন আসা-যাওয়ার মিছিলে। সতীর্থদের এই পরিণতি দেখতে দেখতে একটা সময় হার মানতে হয় তাকেও। তবে ফেরার আগে ৮৪ বলে ৭৬ রান করেন। বাকিরা দায়িত্ব না নেওয়ায় ৩৪.৩ ওভারে মাত্র ১৭১ রান তুলতেই থেমেছে বাংলাদেশের ইনিংস। ব্যাটারদের ব্যর্থতায় ঘরের মাঠে ১৫ বছর পর নিউজিল্যান্ডের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হারতে হলো বাংলাদেশকে।

অধিনায়ক হিসেবে অভিষেকটা ঠিকই রাঙিয়েছেন শান্ত। ওয়ানডে ফরম্যাটে তিনি বাংলাদেশের ১৬তম অধিনায়ক। নেতৃত্ব পেয়েই ২৫ বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙেছেন দারুণ ছন্দে থাকা এই ব্যাটার। অ্যাডাম মিলনের করা ইনিংসের ২৭তম ওভারের তৃতীয় বলটি মিড অন দিয়ে সীমানা ছাড়া করে গড়েন অন্যরকম রেকর্ড। এই বাউন্ডারিতে তার নামের পাশে লেখা হয় ৭১। এই অঙ্কটাই পেছনে ফেলে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ২৫ বছর আগের রেকর্ডটি। ১৯৯৮ সালে ভারতের বিপক্ষে মোহালিতে বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক হয়েছিল বুলবুলের। সেই ম্যাচে ১২৬ বলে ৭০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন অভিষেক টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান। সেই রেকর্ডটাই পেছনে ফেলেছে শান্তর ৭৬। ব্যক্তিগত এই কীর্তির দিনে অবশ্য শান্তর সঙ্গী হয়েছে ৭ উইকেটে বড় হারের হতাশা। বাংলাদেশের দেওয়া ১৭২ রানের মামুলি লক্ষ্য স্বাগতিকদের চেয়ে দুই বল বেশি ব্যবহার করে তুলেছেন কিউই ব্যাটাররা।

এশিয়া কাপ আর বিশ্বকাপের মধ্যে স্যান্ডউইচ সিরিজটি বাংলাদেশ সেভাবেই গুরুত্বই দেয়নি। প্রতি ম্যাচেই বদলে গেছে একাদশ। প্রথম ম্যাচটা বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার পর দ্বিতীয় ম্যাচে ৮৬ রানে হারতে হয় স্বাগতিকদের। মঙ্গলবার ছিল সিরিজ বাঁচানোর ম্যাচ। তবে এই ম্যাচেও বাংলাদেশকে খেলতে হয়েছে নিয়মিত অনেককে ছাড়া। নিয়মিত ওপেনার লিটন কুমার দাস, তামিম ইকবাল, মোস্তাফিজুর রহমানদের এই ম্যাচে দেওয়া হয় বিশ্রাম। নাজমুল হোসেন শান্ত ছাড়াও তৃতীয় ওয়ানডের স্কোয়াডে ফেরানো হয়েছিল তাসকিন আহমেদ, মেহেদী হাসান মিরাজদের। অসুস্থতা ও চোটের কারণে তাসকিন ও মিরাজ খেলতে পারেননি। তাছাড়া বিশ্বকাপের দল নিয়ে নানা বিতর্কে মাঠের খেলায় মনঃসংযোগটাই যেন কেটে গিয়েছিল ক্রিকেটারদের। যার প্রভাব পড়েছে খেলায়।

আনাড়ি তানজিদ তামিম ও জাকিরকে পাঠাতে হয় ট্রেন্ট বোল্ট, অ্যাডাম মিলনেদের সামলাতে। জোরে বলের দুই তারকাকে সামলাতে পারেননি এই তরুণ। দলীয় ৬ রানে জাকিরের স্ট্যাম্প উপড়েছেন মিলনে। আর বোল্টের আউট সুইঙ্গারে খোঁচা দিয়ে ফিরেছেন তানজিদ। ৮ রানে দুই ওপেনারকে খোয়ানোর পর দুই ইনফর্ম শান্ত ও তাওহিদ হৃদয়ের দায়িত্বটা ছিল ইনিংস মেরামতের। শুরুতে দেখে মনে হচ্ছিল শান্তকে যোগ্য সঙ্গটা দেবেন হৃদয়। তবে ভালো শুরুর পর অহেতুক মিলনের অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বল সজোরে মারতে গিয়ে কভারে উইল ইয়ংকে ক্যাচ প্র্যাকটিস করান ১৮ রান করা হৃদয়। তার বিদায়ের পর দুই অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদুল্লাহ পারেননি শান্তর সঙ্গে ইনিংসটা এগিয়ে নিতে। চতুর্থ উইকেটে ৫৩ রানের জুটি গড়েছিলেন শান্ত ও মুশফিক মিলে। তবে লকি ফার্গুসনের একটা সহজ বল ঠিকঠাক ডিফেন্স করতে পারেননি ২৫ বলে ১৮ রান করা মুশফিক। এক ড্রপে বল গিয়ে ভেঙে দেয় স্ট্যাম্প। মাহমুদুল্লাহ এসেও ভালো শুরু করেও মিলনের সুইংয়ের কাছে পরাস্ত হয়েছেন। শান্তর সঙ্গে ৪৯ রানের জুটি গড়েছিলেন মাহমুদুল্লাহ। জুটিটা যখন জমে যাচ্ছিল, তখনই দ্বিতীয় স্পেলে মিলনেকে আক্রমণে আনেন কিউই অধিনায়ক ফার্গুসন। প্রথম বলেই ২৭ বলে ২১ রান করা মাহমুদুল্লাহকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন এই ডানহাতি ফাস্ট বোলার।

শান্ত অবশ্য তখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দারুণ সাবলীল ব্যাটিংয়ে ক্যারিয়ারের পঞ্চম ফিফটিও পেয়ে যান। এরপর গড়েন অভিষেকে অধিনায়কের সর্বোচ্চ রানের সেই রেকর্ড। একার লড়াইয়ে শেখ মেহেদী হাসানকেও দেখেন ১৩ রান করে বোল্টের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হতে। এরপরই শেষ হয় শান্তর একার লড়াই। দলীয় ১৬৮ রানে কোল ম্যাকনচির এলবিডব্লিউয়ের শিকার হন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার বিদায়ে ২০০ রান পেরুনোর লক্ষ্যটাই ভেস্তে যায়। টেল এন্ডাররা সেভাবে প্রতিরোধ গড়তে না পারায় ১৭১ রানে গুটিয়ে যায় স্বাগতিকরা। মিলনে ৩৪ রান খরচায় ৪ উইকেট নিয়ে মূল আঘাতটা হেনেছেন বাংলাদেশ শিবিরে। এছাড়া বোল্ট ও ম্যাকনচি নেন ২টি করে উইকেট।

সহজ লক্ষ্যে খেলতে নেমে অবশ্য এই ম্যাচে ফেরা শরীফুল ইসলামের গতি খানিকটা ভুগিয়েছিল কিউই ব্যাটারদের। ইনিংসের দশম ওভারে পরপর দুই বলে এই বাঁহাতি ফাস্ট বোলার অ্যালেন ফিন ও ডিন ফক্সক্রফটকে ফেরান দারুণ দুই ডেলিভারিতে। ডিপ ফাইন লেগে নাসুম আহমেদকে ক্যাচ দেওয়ার আগে ফিন ২৬ বলে করেন ২৮ রান। ৪৯ রানে দুই উইকেট হারানো কিউইদের অবশ্য সেভাবে আর বিপদে ফেলতে পারেননি বাংলাদেশের বোলাররা। ওপেনার উইল ইয়ং হেনরি নিকোলসের সঙ্গে গড়েন ৮১ রানের জুটি। ৮০ বলে ১০ চার ও এক ছয়ে ৭১ রান করে ইয়ং বিদায় নেওয়ার পর টম বান্ডেলকে নিয়ে বাকিটা পথ নির্বিঘেœই পাড়ি দেন ৮৬ বলে হাফ সেঞ্চুরি করা নিকোলস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত