স্থায়ীভাবে আইপিএলে চুক্তিবদ্ধ হতে পারেন ক্রিকেটাররা

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২২, ০৫:১৩ পিএম

ধারণা করা হয় বিশ্বের প্রথম টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (আইসিএল)। তবে স্থায়ী হতে পারেনি সেটি। বরং টিকে আছে এক বছর পর শুরু হওয়া আইপিএল। যা শুধু ধারাবাহিকভাবে আয়োজিতই হয়ে আসছে না। ক্রিকেটে রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। যে বিপ্লব আন্তর্জাতিক তথা টেষ্ট ক্রিকেটকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এমনকি তারকা খেলোয়াড়দের মাঝে দেশের চেয়ে আইপিএলকে এগিয়ে রাখার মতো মানসিকতা তৈরি হবে। আগামীতে এই লিগের ফ্রাঞ্চাইজিগুলোতে ক্রিকেটারদের স্থায়ীভাবে চুক্তিবদ্ধ হতেও দেখা যেতে পারে বলে ধারণা প্রকাশ করেছে ডেইলি মেইল।

করোনা মহামারী পৃথিবীতে আঘাত হানার আগে ২০১৯ সালে আইপিএলের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ছিল ৫ লাখ ৫ হাজার ৩ কোটি ৬৩ লাখ ২৮ হাজার ৪৭৬ টাকা। যা এই মুহূর্তে আরও বাড়তে পারে। গত জুনে আইপিএলের সম্প্রচার সত্ব বিক্রি হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি রুপিতে। প্রতি ম্যাচে যা থেকে আইপিএল আয় করবে ৫৮ কোটি রুপি। টুর্নামেন্টের এক আসর থেকে হাজার কোটি আয়ের আশা প্রকাশ করেছেন বিসিসিআই সেক্রেটারি জয় সাহা।

আইপিএলে টাকার এত ছড়াছড়ি শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। টুর্নামেন্টের ফ্রাঞ্চাইজিগুলো দল কিনেছে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগেও। দক্ষিণ আফ্রিকা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে এখনও শুরু হয়নি টুর্নামেন্ট। তবে শীঘ্রই শুরু হতে যাওয়া এমন লিগে দল কিনতে মুখিয়ে আছে আইপিএল দলগুলোর মালিকরা। আইপিএল যেন বিশ্ব ক্রিকেট ফ্রাঞ্চাইজি লিগগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে।

টাকার ছড়াছড়ির মোহে জড়িয়েছেন ক্রিকেটাররাও। অনেক দেশেরই আইপিএল চলাকালে সিরিজ থাকে না। থাকলেও সেদেশের ক্রিকেটাররা আইপিএলকেই যেন প্রাধান্য দিতে চান। সাকিব আল হাসান গত বছর দল না পেলেও মোস্তাফিজকে নিয়েছিল দিল্লি ক্যাপিটালস। সে সময় বাংলাদেশের সিরিজ চলছিল শ্রীলংকার সঙ্গে। তবে বিসিবি থেকে ছাড়পত্র নিয়ে তিনি আইপিএলেই তখন ব্যস্ত ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ডেভিড ওয়ার্নারের ক্যারিয়ারও গোধূলিতে। মাত্র দুই মাসে কাড়িকাড়ি অর্থ আদায় করা যায় বলে তিনি আন্তর্জাতিকের পাশাপাশি শুধু আইপিএলটাই খেলেন। বিগব্যাশ লিগ থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন তিনি। দল পেলে আইপিএল না খেলে থাকতে পারেন না ওয়ার্নারের আরেক সতীর্থ স্টিভ স্মিথও।

শুধু তারাই নন। বিশ্বের অনেক দেশের ক্রিকেটাররাই দেশের আগে আইপিএল কিংবা ফ্রাঞ্চাইজিকে গুরুত্ব দেন। ক্যারিবীয়ান ক্রিকেটাররা তো বছরের পর বছর কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকেন না এসব লিগ খেলে বেড়াবেন বলে। আগামীতে এই মাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে উঠে এসেছে ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আগামীতে আইপিএল ফ্রাঞ্চাইজিগুলো খেলোয়াড়দের স্থায়ীভাবে চুক্তিবদ্ধ করতে পারে। শাহরুখ খানের দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের প্রধান নির্বাহী ভেঙ্কি মাইসোর দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, ‘শুধুমাত্র আইপিএল মৌসুমেই নয়, খেলোয়াড়দের স্থায়ীভাবে চুক্তিবদ্ধ হওয়া অনিবার্য। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের পরীধি আরও বাড়বে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত দিক দিয়ে আরও শক্তিশালি হতে হবে। চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়কে আমরা বিভিন্ন লিগে খেলাতে পারি। আশা করি আগামীতে এটা হবে। সেদিন আমি অবাক হব না।’

খেলোয়াড়দের স্থায়ীভাবে চুক্তিবদ্ধ করার বিষয়টি ভেঙ্কি মাইসোরের একান্ত মতামত ভেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতের বাইরে অন্য টি-টোয়েন্টি লিগ গুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে আইপিএল ফ্রাঞ্চাইজিগুলো সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ছয়টি টি-টোয়েন্টি দলই আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানাধীন। এছাড়াও, কলকাতা, রাজস্থান এবং পাঞ্জাবও ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোর মালিক। কয়েক দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ইউএস মেজর লিগ ক্রিকেট টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে। আগামী বছরের গ্রীষ্মে মাঠে গড়াবে লিগটি। এই লিগেও রয়েছে নাইট রাইডার্সের ফ্রাঞ্চাইজি।

এর মানে হলো পরিকল্পিতভাবেই এই পথে এগিয়ে চলছেন তারা। ফুটবলে যেমনটি হয়, এক ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকলে অন্য ক্লাবে লোনে পাঠানো যায়। তেমনি আইপিএলের ফ্রাঞ্চাইজির সঙ্গে স্থায়ীভাবে চুক্তিবদ্ধ হলে অন্য লিগে তাদের মালিকানাধীন দলে খেলোয়াড়দের খেলাতে পারবে। যেখানে টাকার অঙ্কটাও নিশ্চিতভাবেই বেশি হবে বলেই ধারণা করছে ডেইলি মেইল।

আইপিএলের অর্থের দিকে সবচেয়ে বেশি নজর অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারদের। বেঁচে থাকার জন্য ভারতের রাজস্বের উপর নির্ভর করতে হয় বলে টুইট করেছেন ভারতীয় ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার ও সাংবাদিক হার্শা ভোগলে। ভারতীয় ক্রিকেটের ভক্তরা বহুদূরের প্যাভিলিয়নে অর্থায়ন করে চলেছেন বলেও টুইটে তিনি উল্লেখ করেন।

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বিপ্লবের বড় নজির সম্প্রতি দেখিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। তাদের টি-টোয়েন্টি লিগকে সামনে রেখে তারা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একদিনের আন্তর্জাতিক সিরিজ বাতিল করেছে। যেন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়রা দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন টি-টোয়েন্টি লিগের প্রবর্তনের দিকে মনোনিবেশ করতে পারে।

বিশ্বে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট আধিপত্য বিস্তার একেবারেই দোরগোড়ায় বলে দ্য টাইমসে লেখা এক কলামে উল্লেখ করেছেন প্রাক্তন ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল অ্যাথারটন। তিনি লেখেন, ফ্রাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট খেলোয়াড়দের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জন্য সুখবর বয়ে আনতে পারে। তবে ক্রিকেটের জন্য সুখকর নয়। এর প্রভাব বিস্তারে হুমকির মুখে পড়বে টেস্ট ক্রিকেট। ফ্রাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ক্রিকেটাররা বিশ্বজুড়ে লিগ খেলে বেড়াবেন ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনে ভাটা পড়বে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত