এবার সুন্দরবনে গিয়ে এক দিনেই প্রকৃতির যেন সব রূপই দেখতে পেলাম। সকালে ফকফকা রোদ আর ঝাঁ চকচকে রোদের ঠাটে চোখ মেলা দায়। গ্রীষ্মকালে সূর্য কী একটু বেশি গরম হয়? গত ২৯ মে মোংলা থেকে পশুর নদীর লাউডোব ফেরি পার হয়ে সেই রোদেলা বেলাতেই চললাম সুন্দরবন দেখতে। গন্তব্য নিকুঞ্জ ভ্যালি। এপারে শান্তিময় গোলপাতায় ছাওয়া আধুনিক বসতখানা, ওপারে গহিন বন; মাঝখানে নদী। কিন্তু ওখানে পৌঁছতেই দেখলাম পশ্চিমের আকাশে মেঘ উঠছে, হাওয়ায় ভাসছে টুকরো টুকরো জলমাখা মেঘ। তারপরও তাকে উপেক্ষা করে ছোট একটা দেশি নৌকায় করে মাঝি পরিতোষ মণ্ডল আমাদের নিয়ে চললেন সুন্দরবনের মধ্যে। তক্ষুণি না গেলে বনে ঢুকতে পারব না, সরু খালগুলো দিয়ে ছোট্ট নৌকায় ঢুকতে হবে। জোয়ার চলে গেলে খালে পানি অনেক কমে যায়, নৌকা চলে না। তাই তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়লাম বন দর্শনে।
বেড়াতে বেড়াতে গাছ দেখা এ এক চমৎকার আনন্দ। সুন্দরের সঙ্গে প্রকৃতি পাঠ, গহিন বনের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা অমৃতের সন্ধান করা। এবারের লক্ষ্য বাংলা প্রকৃতির অমৃত ‘বনফুল’ খোঁজা। বনের শুরুতেই প্রথমে চোখে পড়ল এক নীল নয়নাকে। জলের কিনারে গলা ডুবিয়ে হরকুঁচকাঁটার নীল ফুলগুলো যেন ওর বিজয়বার্তা ঘোষণা করছে। লোনাজলে ও তীব্র স্রোতে কীভাবে গাছগুলো টিকে আছে, সেটাই বিস্ময়। ওটাই যেন ওর বিজয়। সেসব গাছ পেরিয়ে সরু খাল দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল কালিলতার ফুল। চকচকে সবুজ ত্রিপত্রকবিশিষ্ট লতানো গাছের পাতার বোঁটার কোল থেকে লম্বা ছড়ায় খুদে গোলাপি ফুলগুলো কি মোহনীয় রূপে ফুটে রয়েছে! ফুলগুলো দেখতে অনেকটা বসন্ত মঞ্জরির মতো, তবে আকারে বেশ ক্ষুদ্র। ফুলের ছড়াগুলো বাতাসে দুলে দুলে যেন অভিবাদন জানাচ্ছে।
কালিলতা একটি ম্যানগ্রোভ সহবাসী উদ্ভিদ। ফ্যাবেসী তথা শিমগোত্রী এ গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম উবৎৎরং ঃৎরভড়ষরধঃধ, ইংরেজি নাম কমন ডেরিস। এ লতার অন্য নামগুলো হলো গুয়ালালতা, গোয়ালিলতা, পানলতা, ফেলিয়ালতা ও পানগোটা। এই গাছ চিরসবুজ, বহুবর্ষজীবী, বহুশাখায়িত, কাষ্ঠল আরোহী লতানো গুল্ম। শাখা মসৃণ, বাকল গাঢ় ধূসর ও কিছুটা খসখসে, কাণ্ড ও তরুণ শাখা ছড়ানো বায়ুরন্ধ্র বা লেন্টিসেল দ্বারা আবৃত। আরোহী লতা ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। কাণ্ডের গোড়া থেকে কিছু বায়ব মূল গজায়। পাতা যৌগিক, তিন থেকে পাঁচটি পত্রকবিশিষ্ট, কাণ্ডের সঙ্গে বিপরীতমুখীভাবে থাকে। পাতা উপবৃত্তকার, গাঢ় সবুজ, নিচের পিঠ হালকা সবুজ, পত্রক ৬-১৫ সেন্টিমিটার লম্বা। পত্রক্ষ থেকে রেসিম পুষ্পমঞ্জরিতে ফুল ফোটে। ফুলের পাপড়ি পাঁচটি। ফুলের রঙ সাদাটে গোলাপি। ফুল ফোটে মার্চ-মে মাসে। ফল ধরে মে-জুলাইতে। ফল চাকতির মতো শুটি, পাতলা ও চ্যাপ্টা, হলদে সবুজ; খোসা মসৃণ। ফলের ভেতরে একটি বীজ থাকে। বীজ বৃক্কাকার ও চাপা। বীজ থেকে চারা হয়। পাকা ফল ফেটে বীজ পানিতে পড়লে তা ভেসে ভেসে অনেক দূরে যায় ও সেখানে বংশবিস্তার করে।
এ গাছে রোটেনন নামক বিষাক্ত উপদান থাকায় এর বাকল ও শিকড় মাছ মারার বিষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মজবুত কাণ্ড রশি হিসেবে কাজে লাগে। এ গাছের ভেষজ গুণ আছে। লোকচিকিৎসকরা এ গাছের বিভিন্ন অংশ রিউম্যাটয়েড আথ্রাইটিস, পেশির খিঁচুনি, ত্বকের ক্ষত ও পরজীবী সংক্রমণ নিরাময়ে ব্যবহার করে থাকেন। সাতমাথায় অস্থিসন্ধির নির্দিষ্ট স্থানে এ গাছের বাকল ও শিকড়ের রস তেলের সঙ্গে মিশিয়ে মালিশ করলে উপশম পাওয়া যায়। পাতা ও বাকল থেকে পুলটিস তৈরি করে ছোটখাটো কাটা, ঘা ও ক্ষতে বাহ্যিক প্রয়োগ করা হয়। এ রসে বিশেষ ধরনের ফ্ল্যাভোনয়েড রাসায়নিক উপাদান থাকায় স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াসের মতো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রোধ করে। সুন্দরবন অঞ্চলের জনগোষ্ঠী পেশির খিঁচুনি সারাতে প্রাচীনকাল থেকে কালিলতা পাতার ক্বাথ ব্যবহার করে আসছেন। তবে এসব চিকিৎসা কোনো ভেষজ চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত।
কালিলতা গাছের আবাসস্থল সমুদ্র উপকূলবর্তী কর্দমাক্ত এলাকা। সুন্দরবনের চারদিকে বা পাশে সাধারণত কর্দমাক্ত অথবা বালুকময় ভূমিতে কালিলতা গাছ জন্মে। যেসব স্থানে স্বাদুপানির প্রবাহ আছে ও জোয়ারের স্বাদু পানিতে নিমজ্জিত হয়, সেরূপ স্থানে কালিলতা গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। মায়ানমার, শ্রীলংকা, চীন, উত্তর অস্ট্রেলিয়া ও মাদাগাস্কারে এ গাছ আছে। বাংলাদেশে সুন্দরবন ও চট্টগ্রাম উপকূলে এ গাছ দেখা যায়। কালিলতা গাছ বর্তমানে প্রায় সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ইন-সিটু পদ্ধতিতে এ প্রজাতির গাছ সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
