ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমের যোগদান ঠেকাতে গতকাল সোমবার মতিঝিল এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন। কর্মসূচি থেকে আন্দোলনকারীরা চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ ৫ দফা দাবি জানান। তবে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল করা হবে না বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে। এ সময় পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় এলাকাটিতে দিনভর থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল।
জানা গেছে, গত ২৪ মে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোরশেদ আলম। ওই দিন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভা হওয়ার কথা থাকলেও সচেতন গ্রাহক ফোরামের আন্দোলনের মুখে ওই সভা হয়নি। পরে গতকাল সোমবার পর্ষদ সভার নতুন দিন ঠিক করা হয়। ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারে সভাটি হওয়ার কথা থাকলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে জানান, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমকে নিয়োগের প্রতিবাদে একটি মহল ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে। এ সময় নতুন চেয়ারম্যানকে কাজে যোগদানে বাধা দেওয়া হয়। এতে মতিঝিল ব্যাংকপাড়ায় অস্থিরতা তৈরি হয়। তিনি বলেন, খোরশেদ আলমকে নিয়োগের সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অটল রয়েছে। কারণ তার নিয়োগ যথাযথ নিয়মে করা হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খোরশেদ আলমকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কেন ‘মব’ করে বের করে দেওয়া হয়েছিল, সেটিও তদন্ত করা হবে বলে তিনি জানান।
মুখপাত্র আরও বলেন, খোরশেদ আলমের সভাপতিত্বে রাতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় পর্ষদের পাঁচজন সদস্য ভার্চুয়ালি অংশ নেন। সভায় সম্প্রতি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের জমা দেওয়া পদত্যাগপত্র গ্রহণ ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত এমডি মো. আলতাফ হোসাইনকে দায়িত্বে বহাল রেখে ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানান।
উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসাইন দেশ রূপান্তরকে জানান, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো আমানতকারীরাও ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন কামনা করেন। সম্প্রতি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেছেন। নতুন চেয়ারম্যানের গতকাল দায়িত্বগ্রহণের কথা থাকলেও ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকায় তিনি যোগ দিতে পারেননি। ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রমে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রভাবশালী মহলের চাপ রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আলতাফ হোসাইন বলেন, আমরা স্বাভাবিকভাবেই কাজ করছি। কোনো ধরনের চাপ নেই। ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
সমাবেশে সচেতন গ্রাহক ফোরামের সদস্য খন্দকার মাহবুবুল হক বলেন, ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় থেকে আমার অ্যাকাউন্ট আছে। এই ব্যাংক পরিচালনা করতে শরিয়াহ জানতে হবে, সৎ থাকতে হবে। নতুন চেয়ারম্যানকে দিয়ে ব্যাংক চালানো যাবে না। আমরা চাই ইসলামী ব্যাংক আগে যেভাবে চলেছে, সেভাবে চলুক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ঈদের ছুটির আগে শেষ কার্যদিবসে (২৪ মে) ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোরশেদ আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার আগে সেদিন চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করেন।
গ্রাহক ফোরামের ৫ দফা দাবির মধ্যে ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে অবিলম্বে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমের অপসারণ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের পুনর্বহাল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগ বা নতুন গভর্নর নিয়োগ, আগে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইসলামী ব্যাংকের সামনে বা আশপাশে আসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং দাবি বাস্তবায়ন না হলে লাগাতার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন ফোরামের নেতারা। গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের অন্তত ২৩ সদস্য আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫ জনকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার এনএম নাসিরুদ্দিন বলেন, সকালে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক নামে মতিঝিল দিলকুশা এলাকায় লোকজন সমবেত হতে থাকে। এতে ব্যাংকপাড়ায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ উপস্থিত লোকজনদের বুঝিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে দাবি-দাওয়া আদায়ে তারা বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে পুলিশ বাণিজ্যিক এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় দায়িত্বরত কয়েকজন পুলিশ আহত হয়েছেন।
জামায়াতের নিন্দা : ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে জামায়াত। গতকাল সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে সাধারণ গ্রাহকরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। কিন্তু পুলিশ কোনো উসকানি ছাড়াই তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে এবং জলকামান ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি চালিয়ে বহু আমানতকারীকে মারাত্মকভাবে আহত করে। পুলিশের এ অযাচিত বলপ্রয়োগ ও দমনপীড়ন অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং গ্রাহকদের যৌক্তিক দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করছি।
