কেলেঙ্কারির রাতে সিরিজও হারল বাংলাদেশ

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০২:৩৫ এএম

সংক্ষিপ্ত স্কোর

উইন্ডিজ : ১৯০ (১৯.২ ওভার)

বাংলাদেশ : ১৪০ (১৭ ওভার)

ফল : উইন্ডিজ ৫০ রানে জয়ী।

সিরিজ : উইন্ডিজ ২-১-এ জয়ী।

কলম্বোর নিদাহাস ট্রফির নাটকীয়তা যেন ফিরে এলো মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে! আম্পায়ার তানভির আহমেদ একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত দেন। কেন ‘নো’ ডাকেন, আম্পায়ার তানভির আহমেদ ছাড়া আর কেউ ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না! ৮ মিনিট খেলা বন্ধ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক কার্লোস ব্রাফেটকে নিচে নেমে এসে ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো কী যেন বোঝান। বোঝেন ক্রিকেটার। কলম্বোর মতো কেলেঙ্কারি দেখতে হয় না মিরপুরকে। উল্টো ভয়াবহ এলোমেলো ব্যাটিং দেখিয়ে ‘ত্রিমুকুট’ অর্জনের বদলে ক্যারিবিয়ানদের বছরের শেষ উপহারটা দিয়ে আসেন সাকিবরা। ২-১-এ তিন ম্যাচের টি-টুয়েন্টি সিরিজ উইন্ডিজের।

আড়াইশো করার হুমকি দিয়েও ১৯০-এ অলআউট টস হেরে ব্যাট করা অতিথিরা। জেতার মতো রান। কিন্তু বাংলাদেশেরও ২১৫ রান করে বিদেশে জেতার রেকর্ড আছে। প্রতিপক্ষের ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকিয়ে বোলারদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিলেন পার্টটাইম স্পিনার মাহমুদউল্লাহ। আগের ম্যাচেই ২১১ রান করা বাংলাদেশ এখানে শিশির আক্রান্ত মাঠে পরে ব্যাট করার সুযোগ পায়। প্রথমবারের মতো এক মলাটে এক প্রতিপক্ষকে তিন সিরিজই হারিয়ে ত্রিমুকুট মাথায় তোলার সম্ভাবনাটা হাতছানি দিয়ে ডাকে।

কিন্তু আড়ালে ক্রিকেট বিধাতা হাসেন। শীতের রাতের শিশিরে বল গ্রিপ করা কষ্ট। কিন্তু ব্যাট করা? এই দুইয়ের চেয়েও আম্পায়ারিং কষ্ট! আইসিসির বাংলাদেশি আম্পায়ার তানভির আহমেদ চতুর্থ ওভারেই এমনসব সিদ্ধান্ত দিতে থাকলেন যা বিস্ময়কর। কারো মনে হতে বাধ্য, এটা স্থানীয় ক্রিকেটের মতো পক্ষপাতদুষ্ট! প্রথমে নো ডাকলেন গতিময় পেসার ওশেন টমাসকে। কিছুতেই তা নো হয় না। ফ্রিহিটে লিটন দাসের ছক্কা। তামিম ইকবাল (৮) ততক্ষণে রানআউট হয়ে ফিরেছেন সস্তায়।

তানভিরের পরের সিদ্ধান্তটা কেউ কীভাবে মানে? এ তো স্বাগতিক দলের পক্ষেও মানা কষ্ট, স্রেফ নিজের এন্ড থেকে ব্যাটসম্যানের পক্ষে ‘নো’ ধরা সম্ভব নয়। টমাসের পা লাইনেই ছিল। লিটন তুলে দিয়েছিলেন বল। ফিল্ডারের সহজ ক্যাচ। উৎসব করার পরিবর্তে প্রতিবাদে মাততে হয় ক্যারিবিয়ানদের। খেলা বন্ধ হয়। দণ্ড, এ কিসের দণ্ড। কোন অপরাধে?

স্রেফ খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার পরিচয় দিলেন ব্রাফেট। সঙ্গে তার দল। ভদ্রতার খেলাটাকে তারা কলঙ্কিত করলেন না। একজন বাংলাদেশি আম্পায়ারের প্রশ্নবিদ্ধ ভুল অবশ্য কালিটা মাখতে ছাড়েনি।

ততক্ষণে খেলা আর খেলা থাকেনি। মনোযোগ নিশ্চিতভাবেই সরে গিয়েছে সবার। আগের ম্যাচের মতো বিস্ফোরক হয়ে উঠছিলেন লিটন দাস। সৌম্য সরকার (৯) আর সাকিব (০) রানও তেমন করলেন না। একই শটের রেপ্লিকা হয়ে স্পিনার ফ্যাবিয়েন অ্যালেনকে উইকেট দিয়ে এলেন। মুশফিকুর রহিমও (১) তাই। ১ রানের ব্যবধানে নেই ৩ উইকেট!

অথচ চার ওভার শেষে কি না ১ উইকেটেই ৬২ ছিল বাংলাদেশের। দেখতে না দেখতে তিন ব্যাটসম্যানকে হারানোর পর এক কিমো পলের কাছেই আত্মসমর্পণ করতে থাকে বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহর (১১) পর লিটনও (২৫ বলে ৪৩) চলে গেলে আর কিছুই করার থাকে না। মেহেদী হাসান মিরাজের পাশে ১৯ সংখ্যা মাত্র। কিমো পলের প্রথম ৫ উইকেটের ম্যাচে বড়দিনের উপহার দেশে পাঠিয়ে সিরিজ জয়ের উল্লাসে মাতে ক্যারিবিয়ানরা। দীর্ঘ এশিয়া সফরে হারের পর হার শেষে একটি সিরিজ জয়। বাংলাদেশেও আগের দুটিতে হার, ঠেকাতে পারল প্রতিপক্ষের তিন ঘরানায় টানা তিন সিরিজ জয়।

বাংলাদেশের ব্যাটিং কি আম্পায়ারিং বিতর্কে মোমেন্টাম হারিয়ে বসেছিল? নিদাহাস ট্রফির সেই ম্যাচে যৌক্তিক অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ জিতে ফাইনালেও খেলেছিল। ইতিহাসের ভিন্ন স্থান ও কালে উপস্থিতি এবার জয়ের ডালা মেলে ধরেছে বাংলাদেশের নয়, যৌক্তিক অবস্থানে থাকা আরেকটি দলের সামনে। যেখানে আসলে বাংলাদেশের ছন্নছাড়া ব্যাটিংয়ের বড় দায়। বাংলাদেশের নয়।

কী অদ্ভুত ম্যাচই না এটা। বোলিংয়ে পাওয়ার প্লের ছয় ওভারে ৮৮ রান খরচায় ১ উইকেট নিয়েও প্রতিপক্ষকে ২০০-এর নিচে অলআউট করেছিল স্বাগতিকরা। মাহমুদউল্লাহর হাতে অধিনায়ক সাকিব বল তুলে দিলে মাঝের তিনটি ওভারে প্রতিপক্ষের ব্যাটিংকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। শেষ ৫ উইকেট মাত্র ১৪ রানেই ফেলে দেওয়া যায়। শুরুতে কিছু পক্ষে না গেলেও বোলিং ইনিংসের শেষটা ভালোই ছিল। ওখানে আছে ইভিন লুইসের ৩৬ বলে ৮৯ রানের রাজসিক তাণ্ডব। যা থামিয়ে মাহমুদউল্লাহ, সাকিব ও মোস্তাফিজের ৩টি করে উইকেটও শেষে কম উজ্জ্বল নয়।

কিন্তু স্বাগতিক দলের বছরের শেষ তাতে রঙিন হয় না। সৌভাগ্যের মিরপুরও হাত বাড়িয়ে দেয় না। উল্টো বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বছরটাই শেষ হয় স্বদেশি এক আম্পায়ারের বিতর্কে, কেলেঙ্কারিতে। শেষে তাই বাংলাদেশ নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজও নয়। আলোচনায় ঘুরতে থাকেন একজন আম্পায়ার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন আম্পায়ারিংও সম্ভব!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত