জমি অধিগ্রহণে ঝুলছে বন্দরের বে টার্মিনাল

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০২:৩৬ এএম

জমি অধিগ্রহণে আটকে আছে চট্টগ্রাম বন্দরের বহুল প্রত্যাশিত বে টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প। বন্দর জেটিতে জাহাজের আসা-যাওয়া অবাধ করতে এবং ট্রাকের জট কমাতে নেওয়া প্রকল্পটির জন্য ৮৩৯ একর সরকারি খাসজমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ঝুলে আছে তিন বছর ধরে। বেসরকারি জমি অধিগ্রহণ শেষ হলেও বড় অংশের খাসজমি হস্তান্তরের ফাইল পড়ে আছে ভূমি মন্ত্রণালয়ে।

বন্দরের কর্মকর্তারা জানান, কর্ণফুলীর তীরে অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে জাহাজ প্রবেশ ও বের হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল। বে টার্মিনাল নির্মিত হলে জোয়ার-ভাটার হিসাব করতে হবে না। ৯ দশমিক ৫ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারে না, বে টার্মিনালে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব। এখন বন্দর জেটি থেকেই এলসিএল কনটেইনারের পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হয়। এ জন্য প্রতিদিন সকাল থেকে প্রায় সাত হাজার ট্রাককে জেটিতে ঢুকতে হয়। তাতে বন্দরের অপারেশনাল কাজে নানা সমস্যা হয়। বে টার্মিনালে ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণ শেষ হলে, জাহাজের হুক পয়েন্ট থেকে সরাসরি এলসিএল কনটেইনার নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখান থেকে মাল সরবরাহ করা হবে। ফলে বন্দরমুখী ট্রাকের বহরের কারণে সৃষ্ট যানজট থেকে মুক্তি পাবে নগরী।

২০১৪ সালে বঙ্গোপসাগরের তীরে নগরীর হালিশহরের আনন্দবাজার থেকে দক্ষিণ কাট্টলী পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে বে টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন। এর জন্য কোনো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করা হয়নি। বন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিউল আলম প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ তদারকি করছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি এস্টেট ম্যানেজার জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বে টার্মিনালের জন্য প্রস্তাবিত ৯০৭ একর জমির মধ্যে বেসরকারি মালিকানাধীন ৬৮ একর জমির অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের কাছে ৩৬৮ কোটি টাকা হস্তান্তর করে নির্ধারিত জমি বুঝেও নিয়েছে বন্দর। বাকি ৮৩৯ একর সরকারি খাসজমির জন্য বন্দর কর্র্তৃপক্ষের আবেদনের ফাইল ভূমি মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। অধিগ্রহণ করা বেসরকারি ৬৮ একর জমিতে প্রথম ধাপে ডেলিভারি ইয়ার্ড ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করে সেখান থেকেই পণ্য ডেলিভারি দিতে চায় বন্দর। বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ড্রাই ডককে দিয়ে এরই মধ্যে সেখানে মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে।

২০১৪ সালে বে টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় অনুমতি দিলেও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (সিডিএ) অনাপত্তিপত্র নিয়ে সৃষ্টি হয় জটিলতা। সিডিএ প্রায় ১৬ মাস সময় নিয়ে ২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বর অনাপত্তিপত্র হস্তান্তর করে। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সংস্থাগুলোর ছাড়পত্র ও বন বিভাগের জটিলতায় আটকে থাকে আরো নয় মাস। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে পরিবেশ অধিদপ্তর অনাপত্তি দেওয়ার পর বেসরকারি জমির অধিগ্রহণে লেগে যায় পুরো দুই বছর। এখন আটকে আছে ৮৩৯ একর সরকারি খাসজমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এল এ) মমিনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রস্তাবিত জমির বিষয়ে বন্দরের আবেদনটি ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে তা হস্তান্তরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

জার্মানির সেলহর্ন ও হামবুর্গ পোর্ট কনসালটিং ফার্ম প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর আওতায় একটি এক হাজার ৫০০ মিটার দীর্ঘ মাল্টিপারপাস টার্মিনাল, একটি এক হাজার ২২৫ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার টার্মিনাল ও একটি ৮৩০ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার টার্মিনাল। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশ কিছু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই করে দেখছে বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- চায়না মার্চেন্টস স্পোর্ট হোল্ডিং কোম্পানি লিমিটেড, কোরিয়ার ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড, ভারতীয় কোম্পানি এপিএম টার্মিনালস (ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড) ও সিঙ্গাপুরের পিএসএ।

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে গতিশীল করতে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এ জন্য বে-টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়ন অপরিহার্য মন্তব্য করে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতায় প্রকল্পটির মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু না হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তিনি বলেন, ‘সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প হিসেবে এর দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভূমি সংক্রান্ত কোনো অনিশ্চয়তা থাকলে তা দূর হওয়া প্রয়োজন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত