‘ভোটের অধিকার লাগবে না, আমার চক্ষু ফিরায়ে দিতে কন’Ñ এ কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ভোলার লালমোহনের আব্দুল মালেক। উপজেলার পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নের ইলিশাকান্দি গ্রামে তিনি ‘অন্ধ মালেক’ নামে পরিচিত। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। গরু বাঁধার খুঁটি দিয়ে চোখ উপড়ে ফেলার দুঃসহ সেই স্মৃতি মনে পড়লে এখনো কাঁদেন অন্ধ মালেক। শুধু মালেকই নন, নির্বাচন এলেই আতঙ্ক ফিরে আসে ভোলা-৩ আসনের লালমোহন উপজেলার অন্নদাপ্রসাদ ও চরপেয়ারী মোহন গ্রামের সংখ্যালঘু পরিবারগুলোতেও। নির্বাচন পরবর্তী সেই নির্যাতন আর নৃশংসতার ঘটনা আজও তাদের তাড়া করে।
চারদিকে নির্বাচনী আমেজ থাকলেও লালমোহনের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখনো থমথমে নীরবতা। নির্বাচন এই গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে উৎসব নয়, আতঙ্কের আরেক নাম। লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত অন্নদাপ্রসাদ গ্রামের রিংকু রানী দাস জানান, স্বামী গৌরাঙ্গ দাস আর মেয়ে রীতা রানীকে নিয়ে ছিল তার সুখের সংসার। ২০০১-এর নির্বাচন যেন তাদের সব কেড়ে নিয়েছে। চোখের সামনে থেকে ধরে নিয়ে তার ৮ বছরের মেয়ে রীতাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। ধান ক্ষেতে শুয়ে এ দৃশ্য দেখা ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না।
এলাকাবাসী জানায়, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে, সেই সহিংসতায় নির্যাতনের শিকার হয় দুই শতাধিক সংখ্যালঘু পরিবার। তবে রিংকু রানীর মতো অন্নদাপ্রসাদ গ্রামের কত মায়ের সামনে মেয়েকে নির্যাতন করা হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। কেউ বিচার চেয়েছে আদালতে, কেউ লোকলজ্জায় গোপন রেখেছে, পৈশাচিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। এ বিষয়ে ভোলা জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অভিনাশ নন্দী জানান, সেই সন্ত্রাসীরা আজও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু পাল্টে গেছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়। নির্বাচন এলে শুধু ভোটের জন্য সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করলেও কোনো দলই তাদের বিচার করেনি।
২০০১-এর নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিএনপি কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন বীরবিক্রম।
এদিকে, সংখ্যালঘু ও নির্যাতিত পরিবারকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন বলেন, ‘২০০১ সালের মতো আর কোনো সহিংস ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না।’ ভোলা জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মাসুদ আলম সিদ্দিক জানান, ‘সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় আলাদা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ সহিংসতাপ্রবণ গ্রামগুলোতে বিশেষ নজরদারির কথাও বলেন তিনি।
