একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে হামলা, মামলা ও পুলিশি ধরপাকড়ের মুখে পালিয়ে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন দলের তৃণমূলের নেতারা। তারা বলছেন, গত রবিবারের ভোটের পর পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। তবে বিভিন্ন মামলার আসামিরা এখনো পলাতক আছেন।
ভোটের আগের দিন গত শনিবার বিএনপিপ্রধান বিরোধী রাজনৈতিক মোর্চা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়, তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত বিরোধী দলের ১১ হাজার ৫০৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ৯২৭টি। বিরোধী দলের অফিস, মিছিল ও কার্যক্রমে হামলা করা হয়েছে ২ হাজার ৮৯৬ বার। এতে ১৩ হাজার ২৫২ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। মারা গেছেন নয়জন। গত শুক্রবার একদিনেই গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ১২৭ জন; মামলা হয়েছে ৫৯টি। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজনৈতিক কারণে কেউ গ্রেপ্তার হননি। সুনির্দিষ্ট মামলার আসামিদেরই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সব জায়গায় এখনো স্বস্তি ফেরেনি। তার নির্বাচনী এলাকায় বিএনপিদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর এখনো হামলা চলছে। নেতাকর্মীদের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হচ্ছে। সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের হামলায় আহত ১৫ জন নেতাকর্মী হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এ অবস্থায় সার্বিক পরিস্থিতি জানাতে আজ দলের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ‘হামলার’ বিষয়টি দেশবাসীকে জানানো হবে।
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোতাহার হোসেন পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে হামলা-মামলার কারণে নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। নির্বাচনের পর তারা ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তিনি গত সোমবারই ঘরে ফিরেছেন। বর্তমানে ধরপাকড় তেমন একটা নেই। তবে নির্বাচনের আগে যেসব মামলা হয়েছে, সেসব মামলার আসামিরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই পালিয়ে বেড়ানো নেতাকর্মীদের আগাম জামিনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ী থানা বিএনপির নেতা চান মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যাদের নামে মামলা রয়েছে, তারা ঘরে থাকলেও সতর্ক থাকছেন। এর বাইরে যারা আছেন, তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছেন।’
চাঁদপুর সদর থানা বিএনপি নেতা জহিরুদ্দন বাবর বলেন, ‘এখন ধরপাকড় নেই। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও ঘরে ঘরে হামলা দিচ্ছে না। কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। তবে পুরান মামলায় জামিন নিতে হবে নতুন করে।’নাটোরের লালপুর থানা বিএনপির সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম বিমল বলেন, নির্বাচনের পর গত সোমবার তিনি নিজের ঘরে ফিরতে পেরেছেন। এতদিন হামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়ে যারা এলাকাছাড়া ছিলেন, তারা নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে প্রকাশ্য কোনো স্থানে যাচ্ছেন না।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া থানা বিএনপির নেতা মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘বাড়ি বাড়ি পুলিশের হানা এখন নেই। তবে স্থানীয় যেসব নেতাকর্মী ভোটের দিন এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের এখন হয়রানি করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা; ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিচ্ছেন।’খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, নেতাকর্মীদের সবাই বাড়ি ফিরতে পারেননি। বিভিন্ন মামলার যারা আসামি হয়েছেন, তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কারাগারে রয়েছেন ৪০০ নেতাকর্মী।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাসানুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, ‘নেতাকর্মীরা ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে চিহ্নিত ও নির্বাচনের আগে দায়ের হওয়া মামলার আসামিরা এখনো এলাকায় ফিরতে পারছেন না। আদালত থেকে জামিন নিয়ে দ্রুত তারা এলাকায় ফিরতে পারেন।’
কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের নেতা আখতার হোসেন বলেন, এলাকার পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। তবে কিছু নেতাকর্মী ঘরে ফিরলেও বেশিরভাগ এখনো এলাকায় ফিরতে পারেননি। গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে নেতাকর্মীরা সতর্ক থাকছেন। খুব একটা হাটবাজারে যান না।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ বলেন, ‘হামলা-মামলায় এলাকার নেতাকর্মীরা ছিল বিধ্বস্ত। এখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। যাদের নামে মামলা রয়েছে, তাদের জামিনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া যারা জেলে আছেন, তাদের খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে।’
বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, এলাকার পরিস্থিতি এখনো থমথমে। নেতাকর্মীরা ঘরে ফিরতে পারছেন না। এর পাশাপাশি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা তো রয়েছেই। মামলার আসামি হওয়া নেতাকর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আদালত থেকে তাদের জামিন করাতে হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। নেতাকর্মীদের ঘরবাড়িতে এখনো হামলা করছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
