কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডার মধ্যবর্তী একটি সুউচ্চ মালভূমির ওপর অবস্থিত আফ্রিকার লেক ভিক্টোরিয়া। ৩৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩৩৭ কিলোমিটার প্রশস্ত এই লেক পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম লেক। লেকের জল স্বচ্ছ নীল। এই নীল জলেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন আকৃতির প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি দ্বীপ। এসব দ্বীপের বেশিরভাগই জনশূন্য। কিছু কিছু দ্বীপে গড়ে উঠেছে জনবসতি। হ্রদের জলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। অসংখ্য জেলে দ্বীপ থেকে দ্বীপে যাবাবরের মতো ঘুরে বেড়ায় আর শিকার করে বিখ্যাত নাইল-পার্চ মাছ। পশ্চিমা দেশগুলোতে এই মাছের চাহিদা তুঙ্গে। নাইল-পার্চ ছাড়াও উন্মুক্ত তেলাপিয়া মাছের রাজত্ব লেক ভিক্টোরিয়ায়।
লেকের জনবসতিপূর্ণ দ্বীপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত আর বিতর্কিত দ্বীপ হলো র্যাম্বা আইল্যান্ড। এই দ্বীপের অধিকার নিয়ে কেনিয়া আর উগান্ডার মধ্যে বিবাদ এখনো চলছে। দ্বীপটি দুই দেশের সীমানা থেকেই ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যৌনকর্মী, আফ্রিকার কুখ্যাত অপরাধী, মাদক চোরাকারবারিদের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান এই র্যাম্বা আইল্যান্ড।
আমির আর ফকির হওয়ার দ্বীপ
মাত্র ২০০০ বর্গমিটারের ছোট্ট এই দ্বীপে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। দ্বীপের বেশিরভাগ পুরুষই লেক ভিক্টোরিয়ায় মাছ শিকার করে। বাকিরা দ্বীপে ব্যবসা করছে। কেনিয়া, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, কঙ্গো, তানজানিয়া, উগান্ডা-সহ আফ্রিকার প্রায় সব দেশের মানুষই এখানে বসবাস করে। জীবনের ন্যূনতম সৌন্দর্যবোধও তাদের মধ্যে নেই। দ্বীপজুড়ে গাদাগাদি করে থাকা টিনের চালাঘরগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দিনের পর দিন কাটাচ্ছেন দ্বীপবাসী। মাছের আড়ত ছাড়াও দ্বীপে আছে একটি গির্জা, একটি মসজিদ, জুয়ার অসংখ্য কাউন্টার, মদ ও মাদক সেবনের বিভিন্ন আসর, সেলুন, ওষুধের দোকান, খাবার হোটেল ও হাজার তিনেক পতিতা।
র্যাম্বা দ্বীপেই বসবাস করছেন অস্টিন অমোন্ডি নামে এক জেলে। তিনি বলেন, ‘বাইরের লোকেরা জানেন এই র্যাম্বা দ্বীপের মূল ব্যবসা মাছ। কিন্তু এই দ্বীপে হয় না এমন কিছু নেই। মাছ ছাড়া এই দ্বীপে বিভিন্ন জিনিস বেচাকেনা হলেও মূল পণ্য আসলে নারীদেহ, মাদক, জুয়া আর স্থানীয় মদ ছাঙ্গা।’ আমোন্ডি আরও বলেন, ‘লোকে যেমন এখানে আমির হয়, তেমনি ফকিরও হয়। এখানে দেহব্যবসা বেআইনি নয়।’
যৌনকর্মীদের আয় তুঙ্গে
ছোট্ট দ্বীপটিতে পা ফেলার জায়গা নেই, গিজগিজ করছে মানুষ। চার দিক থেকে এসে ভিড়ছে মাছভর্তি জেলে নৌকো। সারা দিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ধরা মাছ র্যাম্বাতে বেচে, সেই পয়সা দিয়েই পতিতা নিয়ে ফুর্তি করে তারা। সারা রাত মদ আর মাদক সেবন করে সকালে শূন্য পকেট নিয়ে আবার মাছ ধরতে যায় তারা। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য যৌনকর্মী র্যাম্বা দ্বীপে এসে আস্তানা গাড়ে। বয়স হয়ে গেলে দ্বীপ ছাড়তে হয় তাদের। দৈনিক ১ হাজার থেকে প্রায় ১২০০ রেন্ড (আফ্রিকান মুদ্রা) আয় করেন তারা। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। দ্বীপে কোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থা না থাকায় নিজেদের পোশাকে লুকিয়ে রাখেন এই টাকা। তাই অনেক সময় গু-া-বদমাশরা কেড়ে নেয় তাদের সঞ্চিত অর্থ। দেখা যায়, কিছু টাকা সঞ্চয় করেই ওই দ্বীপ ছেড়ে পালায় পতিতারা। সঙ্গে করে নিয়ে যায় নানা ধরনের যৌনরোগও। র্যাম্বা দ্বীপের সারি সারি টিনের চালাঘরে বিভিন্ন বয়সের যৌনকর্মীদের ভিড়। জায়গা নেই তাই একই ঘরে দশ বারো জন যৌনকর্মী একই সঙ্গে খরিদ্দার সামলান। ঘরের বাইরে অপেক্ষায় থাকেন খরিদ্দারের দল। অনাদর অবহেলায় রাস্তায় রাস্তায় বড় হয় যৌনকর্মীদের শিশু। অপরিচিত লোকদের হাতে যৌন নিগ্রহেরও শিকার হয় তারা।
নাইল-পার্চ মাছের বিকিকিনি
জেলে নৌকোর মালিকদের বেশিরভাগই এই দ্বীপে বাস করেন না। বেশিরভাগ বোট মালিক র্যাম্বা দ্বীপে তাদের এজেন্ট রেখে দিয়েছেন। এজেন্টদের কাছ থেকে যন্ত্রচালিত নৌকা ভাড়া নিয়ে জলে নামে জেলেরা। বেশিরভাগ জেলেই ১২-৩৫ বছরের স্কুলছুট তরুণ। লাভের ৭০-৮০ শতাংশ মুনাফা পান বোট মালিক, বাকি ২০-৩০ শতাংশ পান জেলেরা। একজন বোট মালিক যত খুশি নৌকা রাখতে পারেন। একজন উগান্ডার মহিলার মালিকানাতেই প্রায় ৩৫টি বোট আছে। এই বোট মালিকরাই অন্যান্য ব্যবসা চালান। দোকান, সেলুন, হোটেল থেকে শুরু করে বার, এমনকি পতিতাপল্লীও।
দিনে দুবার ঘর ভাড়া
টিনের ছাউনি দেওয়া বাড়িগুলো, প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় দু’বার ভাড়া দেওয়া হয়। যারা রাতে মাছ ধরেন, তারা দিনের জন্য ঘর ভাড়া নেন। কেউ দিনে মাছ ধরলে, রাতে ভাড়া নেন। এই বাড়িগুলোকে বলে ‘উসিসেমে’। কিছু ‘উসিসেমে’ বাড়ি যৌনকর্মীরা ভাড়া নিয়ে তাদের ব্যবসা চালায়। পয়সা দিয়েও অনেক সময় এই ছোট্ট দ্বীপের ঘরগুলোতে থাকার জায়গা হয় না। রোজ অসংখ্য মানুষ র্যাম্বা দ্বীপের ঠা-া আবর্জনায় ঠাসা সৈকতে রাতে শুয়ে থাকেন। কারণ এখানে আসা বেশিরভাগ মৎস্যজীবীই যাযাবর ধরনের। বিশাল লেক ভিক্টোরিয়ার জলে ও দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে ঘুরে মাছ ধরেন।
দুর্বল প্রশাসন
র্যাম্বার ২০ হাজার মানুষকে সামলাতে মাত্র ৯ জন পুলিশ সদস্য আছেন। প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগেই যৌনকর্মী আর অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে দ্বীপটি। অপরাধ করে আইনের হাত এড়িয়ে র্যাম্বাতে লুকিয়ে থাকা ও র্যাম্বা থেকে পার্শ্ববর্তী যে কোনো দেশে পালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত সহজ। এর ফলে এখানকার সাধারণ মৎসজীবীরা নিত্যদিন হেনস্তা ও প্রতারণার শিকার হন। একদল বিচ্ছিন্ন ও অপরাধপ্রবণ মাসাই হলো এই অদ্ভুত দ্বীপের সেনাবাহিনী। দ্বীপের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা কেনিয়ার মাসাইদের পয়সা দিয়ে পোষেন। মাসাইরা তাদের সুরক্ষা দেয় এবং নৌকা ভাসিয়ে পাক খায় দ্বীপের চারদিকে।
সাক্ষাৎ নরক
র্যাম্বাতে স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা কেউ ভাবেন না। দ্বীপের চার দিকে থিক থিক করছে আবর্জনা। মলমূত্র, ব্যবহৃত স্যানিটারি প্যাড থেকে কন্ডম, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ ও সুচ। দ্বীপের চারদিকে লেকের জলে ভাসছে আবর্জনা। সেই নোংরা জলেই চলছে স্নান, রান্নাবান্না। চারদিকে শুঁটকি মাছ, ফেলে দেওয়া পচা মাছের গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে মদের গন্ধ। দূষণ ও আবর্জনায় দ্বীপের পরিবেশ এখন পুরোপুরি নরক। ওষুধের বেশির ভাগ দোকান চলে নেশার ট্যাবলেট, অন্যান্য ড্রাগ ও কন্ডম বিক্রি করে। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও মানুষজনের মধ্যে যৌনরোগ দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবার আগে আছে এইডস।
