ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে দুই বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে দুই জঙ্গির লাশ। একজন সেনাবাহিনীর বরখাস্ত মেজর জাহিদ, আরেকজন কথিত আইএস সদস্য আয়াদ হোসেন ওরফে আবু মোহাম্মদ আল-বাঙালির। মর্গে তাদের লাশ পড়ে আছে অজ্ঞাত হিসেবেই।
মর্গের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সালের ২৪ মার্চ ময়নাতদন্ত শেষে বিমানবন্দর থানার সাধারণ ডায়রিভুক্ত অজ্ঞাত তরুণের (২৫) লাশ মর্গের হিমঘরে রাখা হয়েছে। রূপনগর থানার ডায়রিভুক্ত অপর লাশটিও (৪৫) ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে অজ্ঞাত হিসেবেই মর্গে আছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) উপকমিশনার মুহিবুল আলম বলেন, মর্গে থাকা ওই দুই জঙ্গির পরিচয় নিশ্চিত হলেও কোনো দাবিদার না পাওয়ায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা যাচ্ছে না।
অজ্ঞাত হিসেবে থাকা ৪৫ বছর বয়সী নিবন্ধিত মৃতদেহটি সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত মেজর মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের। ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রূপনগর এলাকায় পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযানে তিনি নিহত হন। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা সদরের পাঁচথুবীর পশ্চিম চান্দপুর প্রাইমারি স্কুল রোডে। তার বাবা পুলিশের সাবেক পরিদর্শক নুরুল ইসলাম। জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সেনাবাহিনীর বরখাস্ত এই কর্মকর্তা ‘নব্য জেএমবি’র শীর্ষ নেতা নারায়ণগঞ্জে অপর এক অভিযানে নিহত তামিম চৌধুরীর ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ ছিলেন। তিনি এই জঙ্গি গোষ্ঠীর সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করতেন। এ ছাড়া তিনি অপর জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিতেন।
মর্গে থাকা ২৫ বছর বয়সী অজ্ঞাত লাশটি ২০১৭ সালের ২৪ মার্চ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে চেকপোস্টে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত কিশোরের। পরে পুলিশ জানায়, নিহত ওই কিশোরের নাম আয়াদ হোসেন, তার বাসা ছিল মিরপুরে। ঘটনার আট মাস আগে আয়াদ তার খালাতো ভাই রাফিদ আল হাসানের সঙ্গে নিখোঁজ হয়। দুই ভাই ইন্টারনেটের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ঝুঁকে পড়ে বলে পুলিশের ভাষ্য।
আয়াদ নিহত হওয়ার পর কথিত জঙ্গি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্সের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মুখপত্র আমাকে এক কিশোরের ছবি প্রকাশ করে। ঢাকায় বিমানবন্দরের কাছে বোমা বিস্ফোরণে নিহত বলে তাকে নিজেদের সদস্য দাবি করা হয়। ওই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ছবিতে কিশোরের নাম বলা হয়েছিল আবু মোহাম্মদ আল-বাঙালি। তবে বাংলাদেশে পুলিশের কোনো ইউনিটই এর সত্যতা নিশ্চিত করেনি। তারা বরাবরই বলেছে, ওই আত্মঘাতী হামলাকারী জঙ্গি ছিল মিরপুরের কিশোর আয়াদ। সে সাইট ইন্টেলিজেন্সের দাবি করা আইএস সদস্য নয়। হাসপাতালে অজ্ঞাত লাশটির বয়স ২৫ বলা হলেও আয়াদের বয়স ছিল ১৭ বছর। ২২ মাস ধরে লাশটি মর্গে থাকলেও কেউ নিতে আসেনি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আত্মীয় কেউ না আসায় লাশগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে পড়ে আছে। এগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশকে জানানো হবে। তারা এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
দুই জঙ্গির লাশ মর্গে পড়ে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে অপরাধবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা দিয়ে প্রমাণিত হয়, যারা জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হয়, তাদের পরিবার ও আত্মীয়রাও আপন মনে করে না। জঙ্গিবাদে জড়িত হওয়ার কারণে ওই পরিবারে সামাজিক লজ্জা তৈরি হয়। সামাজিকভাবেও জঙ্গিদের প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়। তিনি বলেন, কেউ মারা যাওয়ার পর সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যায়। তাই সংশ্লিষ্টদের উচিত আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে তাদের লাশ সমাহিত করা।
