দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরও ইতিবাচক রূপান্তর চাই

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০৩:২০ পিএম

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট যে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে, তা তাদের সমর্থকদের উদ্ভাসিত করেছে। দেশটির নতুন প্রজন্ম, যারা উচ্চাকাক্সক্ষী এবং গভীরভাবে বিভক্ত রাজনীতির জন্য বিরক্ত, তাদের জন্য এই নির্বাচন ছিল একটি মাইলফলক। তারা অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের লক্ষ্যেই তাদের এই ভোট দিয়েছে। এই বিজয়ের যে ব্যবধান তা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মতো বিরোধী দলগুলোকে একই সঙ্গে মর্মাহত ও শঙ্কিত করেছে। একসময়কার বলিষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা এবং বিখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেন এই জোটের নেতৃত্বে ছিলেন। সাধারণত যার নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল সেই বিএনপি চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বর্তমানে দুর্নীতির অভিযোগে কারান্তরীণ রয়েছেন। তার বিতর্কিত পুত্র তারেক রহমান বিএনপিকে যুক্তরাজ্য থেকে পরিচালনা করছেন। তিনি ২০০৮ সালে দেশ থেকে পালিয়ে যান এবং যুক্তরাজ্যে একধরনের নির্বাসনে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ এবং হত্যাকা- ঘটানোর জন্য ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে।

একচেটিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা : আওয়ামী লীগ এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনের একচেটিয়া বিজয় অর্জন করেছে। বাকি ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত। তারা সংসদে দলগুলোর সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত হবেন।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর ড. কামাল এবং অন্য বিরোধী নেতারা নির্বাচনকে প্রহসনমূলক বলে অভিযোগ এনেছেন এবং দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মাত্র সাতটি আসনে জয়লাভ করেছে। নির্বাচন কমিশন কিছু নির্বাচনী অনিয়মের উল্লেখ এবং তার তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনী ফলাফলকে বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছে এবং পুনরায় নির্বাচনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। এই বিজয়ের ব্যাপক ব্যবধান ছাড়াও নির্বাচনে আরও যেসব উল্লেখযোগ্য খবর ছিল তা হলো নির্বাচনী অনিয়ম, বিরোধীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন, বিরোধী কর্মীদের ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং ভোটারদেরকে ব্যাপক হুমকি দেওয়া। ভোটের দিন নির্বাচন সংক্রান্ত সহিংসতায় ১৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বেশ কয়েকজন বিরোধীদলীয় প্রার্থী সহিংস প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেন। এ ছাড়া বিরোধীদলীয় নির্বাচনী এজেন্টদের অপহরণ এবং ভোটারদের ভোটদানে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। যদিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলেছেন যে নির্বাচন ব্যাপক স্থানেই শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে। পরপর বিতর্কিত দুটি নির্বাচন আয়োজন করলেও এবং একধরনের কর্তৃত্ববাদী আচরণ বৃদ্ধি পেলেও শেখ হাসিনা আরও পাঁচ বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হলেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি উদ্দীপক রেকর্ড তার রয়েছে। গত তিন বছরে বাংলাদেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে ৭.৬ % হয়েছে, যা বিশ্বের দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম।

দ্বিপক্ষীয় ঐকতান : গত এক দশকে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সংযোগ একটি উঁচু পর্যায়ের মাত্রায় পৌঁছেছে। অনেকগুলো চুক্তির মাধ্যমে ভারত তার অনড় ও অপরিবর্তনীয় দ্বিপক্ষীয় নীতি অব্যাহত রেখে সম্পর্কের প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। ভারত তার ‘প্রতিবেশী নীতি’র মূল লক্ষ্য হিসেবে বাংলাদেশকে প্রাগ্রাধিকার দিয়েছে এবং ‘এ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’ ও বিআইএমএসটিইসি (বহুক্ষেত্রিক প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বঙ্গোপসাগরীয় উদ্যোগ) এবং বিবি আইন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল) উদ্যোগের মতো সহ-আঞ্চলিক জোট গঠন এ সম্পর্কোন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশেও অনুকূল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিভাজিত রাজনীতিকে অতিক্রম করে ভারতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থনে অস্বীকৃতি জানিয়ে বাংলাদেশ অনেক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। এর জন্য দুই দেশের মধ্যে বিশ্বস্ততা এবং নির্ভরতা জোরদার হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বৃহৎ শিল্প সহযোগী, এই বাণিজ্যের বার্ষিক পরিমাণ ৯০০ কোটি ডলারের বেশি। ৪,১০০ কিলোমিটার বিস্তৃত সীমান্তের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০-৯০০ কোটি ডলারের মতো। সংযুক্তি, জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দাভিত্তিক সহযোগিতা ব্যাপকমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। পদ্মা সেতু ও আখাউড়া-আগরতলা রেলসংযোগ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সংযুক্তিকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করবে। নৌপথের সংযুক্তিও বাণিজ্যের ব্যয়কে হ্রাস করবে বলে আশা করা যায়।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতি সাইবারস্পেসের মতো সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলো যেন দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগে যুক্ত হতে হতে পারে, সে জন্য বাংলাদেশ কক্সবাজার থেকে আগরতলার আন্তর্জাতিক প্রবেশপথে সাইবার সংযোগ দিয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের নির্মাণকাজে যুক্ত হয়ে ভারত বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচির অংশীদারে পরিণত হয়েছে। ভারত বাংলাদেশের জ্বালানি ঘাটতি মেটানোর জন্য ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এই বিদ্যুৎ প্রকল্পে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ৩৬০০-এর বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে শিল্পের অসাম্যমূলক ভারসাম্য বিদ্যমান। এর জন্য ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনীতির সামঞ্জস্যহীনতাই দায়ী। যাতে বাংলাদেশ ভারতে বেশি পণ্য রপ্তানি করতে পারে সে জন্য ২০১১ সালে দক্ষিণ এশিয়া মুক্ত শিল্পাঞ্চলের অধীনে বিনা শুল্কের পণ্য প্রবেশাধিকার গৃহীত হয়েছে। যার ফলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির স্থলে বর্তমানে ৯০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশের রপ্তানি করার মতো পণ্য সীমিত থাকায় তা ভারতের চাহিদানুযায়ী অপ্রতুল। ভারতের শিল্প উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা সেজ তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। যখন এটি কার্যকর হবে, তখন ভারতীয় কোম্পানিগুলো সেখানে উৎপাদন করতে পারবে এবং ভারতে রপ্তানি করতে পারবে। বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ২০১৭ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুই দেশের মধ্যে ১,০০০ কোটি ডলারের ১৩টি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

অর্থনৈতিক অসামাঞ্জস্যতাকে হ্রাস করতে ভারত লাইনস অব ক্রেডিট বা এলওসি অনুমোদন করেছে; যা ৮০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতির দ্বারা অনুমোদিত হয়েছে। যেখানে এলওসি অবকাঠামো এবং সংযোগ প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সে ক্ষেত্রে এখানে সামাজিক উন্নয়ন ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। দ্বিপক্ষীয় উষ্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধির সক্ষমতা তৈরিতে সচেষ্ট থাকছে। ভারতে পর্যটকদের মধ্যে বাংলাদেশি পর্যটক সবচেয়ে বেশি। ভিসা প্রক্রিয়া এখন অনেক সহজ করা হয়েছে এবং বার্ষিক প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা ভারত দেয়। যেহেতু দুই দেশেই ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকি রয়েছে, তাই প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তার বিষয়ে আরো বৃহৎ সহযোগিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশ এরই মধ্যে যারা ইসলামিক স্টেট দ্বারা প্রভাবিত এবং সন্ত্রাসী কর্মকা-ে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত ও কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করেছে। ইসলামী সংগঠনগুলো ধর্মীয় কট্টরপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করার লক্ষ্যে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করতে চায়। এই ধরনের শক্তি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এখন বড় ধরনের পরাজয়ের পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংসদ বর্জন এবং রাজপথের প্রতিবাদে শামিল হবে বলে ধারণা করা যায়। তাহলে তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ব্যাপক মাত্রায় বিঘ্নিত করবে।

সামনে চ্যালেঞ্জ : রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো বিষয়গুলো ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা তিক্ততা সৃষ্টি করে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তামূলক বোঝা সৃষ্টি করেছে। আসামের নাগরিক অন্তর্ভুক্তিতে অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা যুক্ত করে ভারত দ্বিপক্ষয় সম্পর্ককে কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। নদীর পানির অংশীদারিত্ব এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ, কিন্তু তা অনতিক্রম্য নয়।

চীন দক্ষিণ এশিয়ায় যেসব নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। যখন বাংলাদেশ চীনের সামরিক সরঞ্জামের ওপর অনেকটা নির্ভর হয়ে পড়ছিল, তখন ভারত দেশটিকে ৫০ কোটি ডলারের এলওসি প্রদান করে, যাতে সে ভারত থেকে প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সরঞ্জাম আমদানি করতে পারে। এই ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত এবং অগ্রসর করা উচিত। ভারত বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিশ্বের প্রথম নেতা, যিনি শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করেছেন এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরো জোরদার হবে। ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো দৃঢ় হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষায় আছে দুই দেশের জনগণ।

লেখক : সাবেক ভারতীয় কূটনীতিবিদ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার

দ্য হিন্দু থেকে ভাষান্তর : অনিন্দ্য আরিফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত