বাবা সৈয়দ নজরুল ইসলামের মতো তিনিও ছিলেন সৎ, বিশ্বস্ত চরিত্রের। অতিকথন, ক্ষমতার দম্ভ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। একজন উদার পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদের মতোই তিনি নীরবে-নিভৃতে পথ হেঁটেছেন। তদবিরবাজ, মতলববাজ, সুবিধাবাদীরা যেমন তার কাছে ভিড়তে পারেননি, তেমনি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারে ন্যূনতম কলঙ্কের ছিটেফোঁটাও তার গায়ে লাগেনি।
কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে তিনি তাই ছিলেন প্রবাদপ্রতিম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। বৃহস্পতিবার রাতে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যু সংবাদ জানাজানি হওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীরা রাতেই ছুটে যান জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে।
শোকাহত আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কিশোরগঞ্জবাসীর এক অনুভূতির নাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান হিসেবে পারিবারিক ঐতিহ্য এবং একজন সৎ, ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ হিসেবে ক্লিন ইমেজের এমন রাজনীতিবিদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল।
কিশোরগঞ্জে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে বলা হতো ‘বিউটি অব পলিটিক্স’।
দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক দায়িত্বে দৌড়ঝাঁপ দৃশ্যমান নয় অথচ দলের ভেতরে-বাইরে জনপ্রিয়তায় ঈর্ষণীয় এমন রাজনীতিবিদ কোনো দলেই সাম্প্রতিককালে দেখা যায়নি। সৈয়দ আশরাফের এই কারিশমার রহস্য কারো জানা নেই। বিষয়টি সবার কাছেই বিস্ময়কর।
তাকে হারিয়ে একজন ভদ্র, বিনয়ী, অজাতশত্রু, আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ, সৎ নেতা ও ক্যাবিনেট মন্ত্রী হারালেন কিশোরগঞ্জবাসী। তার মৃত্যুর সংবাদ কিশোরগঞ্জে পৌঁছালে জেলাজুড়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তারা তাদের প্রাণের নেতাকে অকালে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ১৯৫২ সালে ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
পারিবারিক ঐতিহ্যের সূত্র ধরে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। অংশ নেন একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে। স্বাধীনতার পর তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
সৎ পিতার সৎ সন্তান হিসেবে যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনীতিতে জায়গা করে নেওয়া সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার ডাকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে এসেছিলেন।
১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে দলের চরম ভরাডুবির সময়েও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এই আসন থেকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হ্যাটট্রিক জয়ের পর সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মহাজোট সরকারের মন্ত্রিসভায় লাভ করেন স্থানীয় সরকার পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ সময়ে টানা দুইবার তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ অলংকৃত করেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী করেন শেখ হাসিনা। অসুস্থতার কারণে নির্বাচনের সময় দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তার পক্ষে একাট্টা ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগ ও দুই উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা।
এ ছাড়া ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন।
বিপুল ভোটে তিনি বিজয়ী হলেও শপথ নেয়ার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বহু মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী সৈয়দা শিলা ইসলাম ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর থেকেই অন্তরালে চলে যান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের একমাত্র সন্তান সৈয়দা রিমা ইসলাম লন্ডনের এইচএসবিসি ব্যাংকে চাকরি করেন।
এদিকে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আকস্মিক মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছেন না কিশোরগঞ্জবাসি।
তার রাজনৈতিক সহকর্মী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. শরীফ আহম্মেদ সাদী জানান, অসুস্থ হয়ে থাইল্যান্ডে যাওয়ার সময়ও তার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন সৈয়দ আশরাফ।
তিনি কিশোরগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর কিশোরগঞ্জের সর্বস্তরের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনপ্রাণ দিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী করেছেন। নেতাকর্মীরা আশাবাদী ছিলেন তাদের নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দেশে ফিরে আবার মন্ত্রী হবেন এবং তাদের বুকে টেনে নেবেন।
কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. কামরুল আহসান শাহজাহান বলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর শেখ হাসিনা কারাবন্দী হলে আওয়ামী লীগের যে কয়জন নেতা দলের হাল ধরেছিলেন, তাদের অন্যতম। তার মৃত্যুতে কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের অনেক ক্ষতি হয়েছে যা আর কেউ তা পূরণ করতে পারব না।
