উদ্ভাবনী মানসিকতা নিয়ে এগোতে হবে বাংলাদেশকে

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:১৪ পিএম

জানুয়ারি মাসটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্টার্টারের মর্যাদা পেলেও অর্থনীতিতে সেই জায়গাটি জুলাই মাসের জন্য বরাদ্দ। কিন্তু বিশ্বব্যাপী বছর শুরুর মাস জানুয়ারির প্রভাবকে তো আর খাটো করা যায় না। তাই ২০১৯-এর শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কিছু কথা বলার এবং কিছু পূর্বানুমান করার দুঃসাহস করা যেতেই পারে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মনে হয় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এত শক্ত অবস্থানে থেকে ইংরেজি নতুন বছর শুরু করছে। এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের, যা এইচএসবিসি রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৩০-এ ৭০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। বাজার অর্থনীতির নমিনাল টার্মে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন পৃথিবীতে ৪২তম আর ক্রয়ক্ষমতার বিচারে পৃথিবীতে ৩১তম। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার উপমহাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম। অর্থাৎ আমাদের টাকার মান এ দেশে ২৭ বছর ধরে লুটতরাজ চালানো পাকিস্তানের চেয়েও এগিয়ে। আইএমএফের হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রায় ১৭৫৪ ডলার। এসব দেখে, বলাই যায় বাংলাদেশের অর্থনীতি সঠিক পথেই আছে।

কিন্তু অর্থনীতিতে উন্নতির রাস্তাটি অনেকটা আমাদের দেশের রাস্তার মতোই। সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। বিভিন্ন বাঁকে অপেক্ষা করে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। আমার মতে, আসলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি খুবই নাজুক সময় পার করছে। আমাদের উন্নতির শুরুটা আমরা ঠিকঠাক মতোই করেছি। কিন্তু আমাদের যাত্রাটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালনার জন্যই ২০১৯ সাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই বছরে আমদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রথম সিদ্ধান্ত হবে, বাংলাদেশ কীভাবে তার আয় বাড়াবে? এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান দুটি উৎস হলো, তৈরি পোশাক রপ্তানি আর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। আরও কিছু সেক্টর থেকে আমরা ভালো আয় করে থাকি যেমন সিরামিক, চামড়া, চা রপ্তানি। আমাদের বর্তমানের আয়ের এসব উৎসের উন্নয়ন সাধনের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই নতুন কিছু ক্ষেত্র থেকে আয় বাড়াতে হবে।

এই ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সিং একটা খুবই ভালো ক্ষেত্র হতে পারে। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট (ওআইআই)-এর মতে, বাংলাদেশ সারা দুনিয়ার আউটসোর্স বাজারে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ আউটসোর্সকারী সরবরাহ করে থাকে। আমাদের তরুণরা প্রতিভাবান, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলানোর মতো স্মার্ট এবং উদ্ভাবনী মানসিকতাসম্পন্ন। ডিজিটাল এই যুগে শুধু ফিজিক্যাল পণ্যকে রপ্তানি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করার মতো বিলাসিতা আমরা করতে পারি না। আমাদের এ বছরই এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, কীভাবে এই সংখ্যাটি আমরা ২০২১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে পারব। আমাদের বুঝতে হবে যে, প্রযুক্তি খাতে উন্নয়ন ছাড়া এখন টেকসই উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব না। আমাদের অবশ্যই প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিনিয়োগই আমাদের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। এটি বুঝতে আমাদের একদিন দেরি হলে আমাদের এক বছর পিছিয়ে দিতে পারে। ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল পণ্য এবং সেবা রপ্তানির জন্য এই বছরে নেওয়া পদক্ষেপই ঠিক করে দেবে আমরা এবং আমাদের অর্থনীতি কোথায় থাকবে ভবিষ্যতে।

এ ছাড়া আমাদের ঝিমিয়ে পড়া কিন্তু সম্ভাবনাময় খাতগুলো যেমন পর্যটন, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাবার এসবের জন্য আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের বিশাল সংখ্যার তরুণদের জনসম্পদে পরিণত করার ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হতে হবে।

আশাবাদী জাতি হিসেবে, আমরা মেনে নিলাম যে, সরকার এই অধমের দেওয়া পরামর্শগুলো মেনে নিল। তাহলে কি বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়ন রকেট বেগে চলতে থাকবে? উত্তর হলো, না। আগের কাজগুলো অর্থ আয়ের রাস্তা। সেই আয়ের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের ওপরেই নির্ভর করবে অর্থনীতি তথা উন্নয়নের সঠিক পথে থাকা।

আর এখানেই সবচেয়ে কঠিন এবং দরকারি সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে। সেটা হলো আমাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। যদিও সরকারকে এখানে সেনাপতির মতো সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে, কিন্তু সামাজিকভাবে সচেতনতা ছাড়া সরকারের একার পক্ষে কোনোভাবেই এতে সফল হওয়া সম্ভব না। কিন্তু অর্থনীতির উন্নয়নকে ধরে রাখতে হলে এর বিকল্পও নেই।

এ ছাড়া ২০১৯-এ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বেশ কিছু ব্যাপারে ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। এর মধ্যে খাদ্যপণ্য বিশেষ করে চালের দাম জনসাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা বাড়তে পারে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোটি হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আকার দ্বিগুণ করতে হবে। আর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা ছাড়া এটা সম্ভব নয়।

ব্যাংক খাতের সংস্কারের ওপরে শুধু ২০১৯ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি নয় বরং সামগ্রিক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনীতির প্রকৃতি নির্ভর করবে। খেলাপি ঋণ, আইনের অপপ্রয়োগ, আস্থাহীনতা কাটাতে এ সময়ই সঠিক পদক্ষেপ না নিলে কোনোভাবেই আমরা আমাদের দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারব না।

দারিদ্র্য বিমোচনও নতুন বছরে বাংলাদেশের সামনে বেশ বড় একটি বাধা। বর্তমানে দারিদ্র্য বিমোচনের হার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশ ধীর। ২০০০-২০০৫ সালে দারিদ্র্য বিমোচনের হার ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০০৫-২০১০-এ কমে ১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০১০-২০১৬ সালে আরো কমে দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সবার কাছে পৌঁছে দিতে হলে অবশ্যই দারিদ্র্যের হার কমাতে হবে, না হলে ২০৩০ সালে আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে। এটি কোনোভাবেই মধ্যম আয়ের একটি দেশের জন্য সম্মানজনক নয়।

নতুন এই বছরে আমরা যদি বেকারত্ব দূরীকরণ, আয়ের অসামঞ্জস্যতা কমানো, দুর্নীতি কমানোর মতো পদক্ষেপ নিই তাহলে নিঃসন্দেহে আমাদের অর্থনীতি অদূর ভবিষ্যতে এশিয়ার মাঝে একটি শক্ত অবস্থানে পৌঁছে যাবে। নতুবা ক্রিকেট খেলার মতো, অসাধারণ শুরুর সুফল খেলাটির জয়ের মাধ্যমে অনুবাদিত হবে না।

অসাধারণ এক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, উন্নয়নের মহাসড়কে সঠিক গতিতে চলতে না পারার অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে অগ্রাধিকার অনুসারে সঠিক পদক্ষেপ না নিতে পারা নিঃসন্দেহে তার মধ্যে খুবই উল্লেখযোগ্য একটি। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, ২০১৯ সালে আমরা এই ভুল করব না। সঠিক পরিকল্পনায় সবাই মিলে, সঠিক দিকে, কল্যাণময় উন্নয়নের দিকে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে

এই ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সিং একটা খুবই ভালো ক্ষেত্র হতে পারে। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট- এর মতে, বাংলাদেশ সারা দুনিয়ার আউটসোর্স বাজারে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ আউটসোর্সকারী সরবরাহ করে থাকে। আমাদের তরুণরা প্রতিভাবান, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলানোর মতো স্মার্ট এবং উদ্ভাবনী মানসিকতাসম্পন্ন

এটাই প্রত্যাশা।

লেখক

সহকারী অধ্যাপক, ফাইন্যান্স, ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত