মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। কিন্তু তার রাজনৈতিক জীবন সততার দীপশিখা হয়ে জ্বলবে। দেশের রাজনীতির ক্রান্তিকালে তিনি বার বার আলো জ্বেলেছেন। সততা আর নিষ্ঠায় কাঁধে তুলে নিয়েছেন কাণ্ডারির দায়িত্ব। কেবল নিজের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নয়, দেশের সামগ্রিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। সৎ ও নীতিবান রাজনীতিবিদের ধ্রুপদী যে রূপ উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়ে এ যুগেও বহমান, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তেমনই এক নাম।
একালে প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষের রাজনীতিবিদদের সমীহ পাওয়া এক বিরল বিষয়। তিনি জীবদ্দশায় যেমন তা পেয়েছেন, তার মৃত্যুর পর দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের শোক ও শ্রদ্ধায় রাজনীতিবিদ আশরাফের এই অর্জন সবার সামনে আবারও মূর্ত হয়েছে। দীর্ঘ নিষ্ঠার মধ্য দিয়েই এটা সম্ভব হয়েছে। সর্বব্যাপী দুর্নীতিতে নিমজ্জনের কালে তিনি ছিলেন সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্য যে, নির্বাচনী হলফনামায় তার দেনার পরিমাণ উল্লেখ ছিল। স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে তার সর্বস্বান্ত হওয়ার কথাও শোনা গেছে।
কেবল সততা নয়, যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়েই এই উচ্চাসনে আসীন হয়েছিলেন তিনি। একজন প্রশাসক হিসেবে তার দক্ষতার কথা সহকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের মুখে মুখে ফিরত। সংসদ সদস্য হিসেবে, মন্ত্রী হিসেবে, দলীয় সাধারণ সম্পাদকের মতো বড় সংগঠকের দায়িত্ব পালনে তার দক্ষতা ও নিষ্ঠার কথা বার বার সামনে এসেছে।
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ হিসেবে সৈয়দ আশরাফের প্রজ্ঞার সুফল দেশের মানুষ পেয়েছে। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করলে বলিষ্ঠ হাতে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে নবম সংসদ নির্বাচনে দলের বিপুল বিজয় এবং দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকার কথা অনেকেই স্মরণ করে থাকেন। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে শক্ত হাতে অনেক কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন তিনি।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে আশরাফ আপসহীন ছিলেন। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে শাহবাগ আন্দোলনের সময় মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হেফাজতে ইসলামকে কঠোর হাতে মোকাবিলা করায় তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। আশরাফ স্বল্পভাষী ও সংযমী রাজনীতিবিদ ছিলেন। অযথা বাগাড়ম্বর কিংবা গণমাধ্যমে সরব উপস্থিতি সযতনে এড়িয়ে চলতেন তিনি। মিডিয়ার বানানো মোহের পেছনে ছুটতে দেখা যায়নি তাকে। কিন্তু রাজনীতিতে নীতি-আদর্শ সব সময়েই জয়ী হয় না। দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সৈয়দ আশরাফের বিদায় মেনে নিতে অনেকেরই কষ্ট হয়েছিল।
কি রাজনীতিতে কি জীবনে, মানুষ চিরদিনই নায়ক খুঁজে বেড়ায়। সৈয়দ আশরাফ একটা দীর্ঘসময় ধরে আমাদের রাজনীতির মাঠের তেমনই এক নেপথ্য নায়ক হয়ে উঠেছিলেন। একটা প্রজন্মকে তিনি অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গেছেন। ফুসফুসের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ব্যাংককের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যুতে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের শোক আর শ্রদ্ধায় আমরা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের চৈতন্যের সেই দীপশিখা জাগরূক হয়ে উঠতে দেখলাম। আজ এবং আগামীর তারুণ্য এই আলো থেকে রাজনীতিতে সততা ও নিষ্ঠার দীক্ষা নিক এটাই প্রত্যাশা।
