প্রাচীন রেল শহর আর পদ্মার রূপসী কন্যা হিসেবে পরিচিত পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী জোড়া সেতু (হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ্ সেতু) এলাকায় আটকে যাচ্ছে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের চোখ। দূর-দূরান্তের মানুষসহ বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে এলাকাটি। প্রাকৃতিক শোভা ও সৌন্দর্যের মায়াময় লীলাভূমি পদ্মার পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা প্রাচীনতম শহর পাকশীর অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক ছুটে আসছেন এখানে। ভ্রমণপ্রিয় মানুষের পদভারে মুখর হয়ে উঠছে এলাকাটি।
ইতিহাসের সমৃদ্ধতা আর কিংবদন্তিদের জন্মস্থান পাবনার মানচিত্রে সগর্বে ভিন্ন মাত্রার জোগান দেওয়া পাকশীর নৈসর্গিক দৃশ্য দূর থেকে কাছে টানে যেকোনো বয়সের মানুষকে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো মানুষ স্বজনদের নিয়ে পাকশীতে ছুটে আসে একটু বিনোদনের আশায়। ছুটির দিনগুলোতে পর্যটক প্লাবনে ভেসে যায় পাকশী জোড়া সেতুর মিলনস্থল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটনের অবকাঠামো নেই পদ্মা বিধৌত পাকশীতে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধা গড়ে তোলা হলেই পূর্ণতা পাবে রূপমাধুর্যের পাকশী। পাকশীকে পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হলে সরকার রাজস্ব পাবে। তৃপ্তি নিয়ে ভ্রমণপিপাসুরা অবলোকন করতে পারবেন পাকশীর রূপ-সৌন্দর্য। ফুরফরা খানকা শরীফ চত্বরে অনুভব করা ও দেখার মতো স্থাপত্যশিল্প রয়েছে। নিথর পদ্মা অভ্যর্থনা জানায় পর্যটকদের। এ সময় ছাতিম শরতের ঘ্রাণ প্রাক-সন্ধ্যায় ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এখানে বন নেই, প্রাচীন বৃক্ষ আছে। হিংস্র প্রাণী নেই, পাখি আছে। উপত্যকা নেই, বাঁধের ঢাল আছে। পাহাড়ি পথ নেই, টানেল আছে। এেহ-পাহাড়ের খেলা নেই, আছে খোলা মাঠের হাওয়া।
তারা বলছেন, বিভাগীয় রেল শহর, জোড়া সেতু এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পাকশীতে বহু অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। পর্যটকরাও সেখানে ভিড় করছে। রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভাগীয় অফিস এই পাকশীতে অবস্থিত হওয়ায় এখানে দর্শনার্থীর ভিড় বরাবরই বেশি। লালন শাহ্ সেতু নির্মাণের পর এ ভিড় আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। লালন শাহ্ সেতু নির্মাণের কারণে এখানে প্রকল্প অফিস, ফরেন কনসালটেন্স অফিস, অফিসার্স রেসিডেনশিয়াল এরিয়া, রেস্টহাউসসহ নানা রকম অবকাঠামো গড়ে ওঠে।
এ ছাড়া পাকশী রিসোর্ট নামে ব্যক্তিমালিকানায় একটি বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন আকরাম আলী খান সঞ্জু নামের ঈশ্বরদীর এক শিল্পপতি।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪২ ফুট উঁচু পাকশীর আয়তন চার হাজার ৫৪৭ একর। পদ্মা অববাহিকার এই স্থানটি ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা পত্তন করে। ব্রিটিশ বাংলোগুলোর বাঁকে বাঁকে ইতিহাস ফিস ফিস করে। বিকেলের সূর্য যখন পদ্মাপাড়ে ডুব দেয়, তখন পর্যটকরা যেন হারিয়ে যান ভালোলাগার সমুদ্রে। পদ্মার পাড়ে বসে পূর্র্ণিমার জোসনা উপভোগ পর্যটকদের নিয়ে যায় অন্য জগতে।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও পাকশী অতুলনীয়। পদ্মায় নৌবিহারের সুযোগ নেই, জোয়ার-ভাটা নেই; আছে চোরাবালি। সঙ্গে আছে নৈসর্গিক নির্জনতা।
স্থানীয়রা বলছেন, ভ্রমণবিলাস কেন্দ্র হিসেবে পাকশীর সম্ভাবনা সার্থক হতে পারেনি পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার মানসম্পন্ন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায়। রয়েছে টয়লেটের সমস্যাও।
গতকাল শুক্রবার ছুটির দিন সকালে সরেজমিনে দেখা যায় ভ্রমণপিপাসুদের উপচে পড়া ভিড়। বগুড়া থেকে আসা রাহেনুল ইসলাম জানান, লালন শাহ সেতু, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, পদ্মার পাড়-সবই তার ভালো লেগেছে। সাবরিনা পারভীন জানান, দর্শনীয় স্থান হলেও এখানে বসার মতো জায়গা নেই। রয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থারও অভাব।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মাহবুবুল হক দুদু জানান, পাকশীতে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতে ঈশ্বরদীবাসী দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। ঈশ্বরদী শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বাচ্চু জানান, পাকশীকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে শুধু ভ্রমণপিপাসুদের সুবিধাই হবে না, এখান থেকে সরকারও বিপুল রাজস্ব পাবে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক বিশ্বাস জানান. পাকশীকে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ঈশ্বরদীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহাম্মদ হোসেন ভূইয়া জানান, পাকশীকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলমান রয়েছে। আশা করি, খুব শিগগির পাকশীতে পর্যটনকেন্দ্র করার ঘোষণা দেবে সরকার।
