একান্ত সাক্ষাৎকারে শাকিল রিজভী
পুঁজিবাজারের ক্রান্তিকালীন সময়ে ২০১০ সাল থেকে টানা দুই বছর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই)
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. শাকিল রিজভী। পরবর্তী সময়ে স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পর টানা তিন বছর পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের শেষার্ধ থেকে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। ডিএসইর সদস্য প্রতিষ্ঠান শাকিল রিজভী স্টক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার আলতাফ মাসুদ
২০১৮ সালে পুঁজিবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো যায়নি। নতুন বছরে পুঁজিবাজার নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
সুদহার বাড়ার প্রভাবে ২০১৮ সালের শুরু থেকেই পুঁজিবাজারে পড়তে দেখা যায়। যদিও গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে সরকার সুদহার এক অঙ্কের ঘরে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়। তবে তারল্য সংকটে ব্যাংকগুলো সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে না পারায় সূচকে নি¤œমুখী ধারা অব্যাহত থাকে। ফলে ২০১৮ সালে সূচক ১৩ শতাংশ কমে যায়। আর নির্বাচনের কারণে বড় বিনিয়োগকারীরা সাইড লাইনে চলে যাওয়ায় লেনদেনও কমে গেছে।
তবে ২০১৯ সালে পরিস্থিতির পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি। সূচক ও লেনদেনে ইতিবাচক ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। নির্বাচনে পূর্ববর্তী সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসায় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকবে; বড় প্রকল্প গতি পাবে এবং পুঁজিবাজারের নীতি সহায়তাও অব্যাহত থাকবে। এছাড়া বিগত দিনের মতো এবার নির্বাচনপরবর্তী তেমন সহিংসতা হয়নি। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকবে বলে আমরা আশা করছি। পাশাপাশি ইমার্জিং কান্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তাতে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে। সব মিলে ২০১৯ সালে পুঁজিবাজার ভালো থাকবে বলে আশা করছি।
২০১০ সালের পর বাজার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেই আবার তা পতন হবে কি না, এমন শঙ্কা ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে। এ কারণে বাজার কিছুটা ভালো হলেই বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। এটা কেন হচ্ছে?
স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও সঞ্চয়পত্রের সুদহার পুরো বাজারকে প্রভাবিত করছে। গত পাঁচ বছরের এফডিআরের সুদহার যদি পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে এক্ষেত্রে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। এখন দেখা যাচ্ছে সুদহার এক অঙ্কে নেমে এলে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে আসবে এবং শেয়ারদর বাড়বে। যদি সুদহার দুই অঙ্কে উঠে যায়, তাহলে কিন্তু আবার চাপ তৈরি হবে। ২০০৯ ও ১০ সালে কিন্তু এমনটি হয়েছে। ২০০৯ সালে সুদহার এক অঙ্কে ছিল, যা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করেছে। তবে ২০১০ সালে সুদহার আবারও দুই অঙ্কে উঠে যাওয়ায় পুঁজিবাজারে বিক্রিচাপ প্রচণ্ড আকার ধারণ করলো।
স্বল্প মূলধনি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে স্বল্প মূলধনি কোম্পানির শেয়ার দর বৃদ্ধিতে কারসাজিরও অভিযোগ রয়েছে।
বাজারের গভীরতা কম থাকা একটি কারণ। যখন ব্যক্তি শ্রেণির বড় বিনিয়োগকারী কিংবা প্রতিষ্ঠান সক্রিয় থাকে না, তখন একশ্রেণির বিনিয়োগকারী বা ডে-ট্রেডাররা চেষ্টা করে স্বল্প মূলধনি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর বাড়িয়ে কিছু অর্থ উপার্জন করতে। শেয়ারসংখ্যা বেশি না থাকার কারণে এমনটি হচ্ছে। আইন করে এটা বন্ধ করা কঠিন। শেয়ারদর বাড়লে দোষের কিছু নেই, যদি না কারসাজি হয়।
শেয়ারদর বাড়বে এমন প্রত্যাশা থেকেই বিনিয়োগ হয়। এক্ষেত্রে স্পেকুলেশনও কাজ করে। ধরুন কেউ কেউ স্পেকুলেশন করেছেন যে, নির্বাচনের পর বাজার ভালো হবে, শেয়ারদর বাড়বে। এজন্য ঝুঁকি নিয়ে নির্বাচনের আগে শেয়ার কেনেন। পরবর্তী সময়ে বাজার ভালো হওয়ায় আরও অনেকেই শেয়ার কেনেন। যিনি নির্বাচনের আগে শেয়ার কিনেছেন, তিনি তো লাভ হলে বিক্রি করবেন। এখন শেয়ারের দর বাড়লেই যদি অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, শাস্তি হয় তাহলে কিন্তু কম দরে শেয়ার কিনতে কেউ আসবে না। এক্ষেত্রে বলতে হবে, আপনি কম দরে বেশি বেশি শেয়ার কিনুন এবং বেশি মুনাফা করুন। কোনো সমস্যা নেই। তবে যদি কয়েকজন মিলে কারসাজি করে দর বাড়ায় সেক্ষেত্রে শাস্তি হোক এবং সেটা বেশি পরিমাণেই হোক।
সারা বিশ্বে পুঁজিবাজারে নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে মিউচুয়াল ফান্ডের পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড দুরবস্থায় রয়েছে। অধিকাংশ ফান্ড অভিহিত মূল্যের নিচে কেনাবেচা হচ্ছে। এর কারণ কী?
আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের কথা বলতে পারি, ভালো রিটার্ন আসায় সেখানে মিউচুয়াল ফান্ডেই সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখানে ব্যতিক্রম। এখানে মিউচুয়াল ফান্ডের খুবই বাজে অবস্থা। অনেক মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটপ্রতি সম্পদমূল্য ১১ টাকা থাকলে তা ৪-৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, এ খাতে আস্থার অভাব। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এ খাত থেকে মুনাফার সম্ভাবনা কম।
এ খাতের বাজে অবস্থার বড় কারণ নগদ লভ্যাংশ না দেওয়া। নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হলে বিনিয়োগকারী এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান (এএমসি) উভয়ের জন্যই লাভজনক হতো। এই ইন্ডাস্ট্রি এভাবে ব্লক হয়ে যেত না। এএমসিগুলো মনে করে, নগদের পরিবর্তে বোনাস লভ্যাংশ দিলে ফান্ডের আকার বাড়বে এবং এতে তার কমিশন বাড়বে। তবে এটি একটি ভুল ধারণা। যদি তারা নগদ লভ্যাংশ দিত এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরাতে পারত, তাহলে এএমসির কিন্তু লাভ বাড়ত। নির্ধারিত মেয়াদে ফান্ড অবসায়ন করে নতুন করে আরও বড় ফান্ড নিয়ে আসতে পারত। এতে বাজারের জন্য অবদান রাখতে পারত, এএমসিগুলোর সামর্থ্যও বাড়ত। কিন্তু সেগুলো না করার কারণে এখন এটা একটা দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকা পড়ে গেছে। বিনিয়োগকারীর আস্থা নেই, নতুন করে ক্লোজ এন্ড ফান্ড আসছে না। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে তাদের বেশি বেশি করে নগদ লভ্যাংশ দিয়ে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে হবে।
স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়ালাইজেশন হয়েছে, মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা আলাদা হয়েছে। এখন ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কি?
দীর্ঘদিন অফিসিয়াল কাজে ও পরিচালনা পর্ষদে মেম্বারদের সম্পৃক্ততা থাকায় মালিকানা থেকে আলাদা হওয়ার পরও চূড়ান্ত বা কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষের কর্র্তৃত্ব এখনো তৈরি হয়নি। হঠাৎ করে ডিমিউচুয়ালাইজেশন হয়ে গেছে এবং এরপর থেকে মেম্বাররা দৈনন্দিন কাজের কোনো সিদ্ধান্তের জন্য প্রভাবিত করেন না। যদি ম্যানেজমেন্ট কোনো পরামর্শ চায়, তাহলে হয়তো তারা সেটা দেন। আর এখন তো পরিচালনা পর্ষদের মেম্বাররা সংখ্যালঘু এবং চেয়ারম্যানও হচ্ছেন স্বাধীন পরিচালকদের মধ্য থেকে। তবে ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকেও উৎসাহিত করা হয়।
