‘দুবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কাজের ক্ষেত্রে আমার আইডিয়াকে
বাস্তবায়ন করার সুযোগ দিয়েছেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। তাই আমি কাজের স্পিরিট পেয়েছি। এর ফলে দলের মধ্যে কোনো বিভাজন তৈরি হয়নি। দলে এখন রাজনীতি আছে। এটাই আমার তৃপ্তি’
‘বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে, হতেই হবে। আর এই বিচারের রায় যখন কার্যকর হবে, বাংলাদেশের মানুষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হবেই হবে’অবিচল এই আস্থা ছিল যে মানুষটির ভেতর, তিনি আওয়ামী লীগের দুবারের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধ বলাই যায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের অপেক্ষায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। গত ৩ জানুয়ারি পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরপারে চলে গেলেন তিনি। সারা জীবন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন যে দলের জন্য, সেই আওয়ামী লীগের আরেকটি মন্ত্রিসভা দেখে যাওয়া হলো না তার।
একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে তার মুখ থেকে শেখ হাসিনার প্রতি অগাধ আস্থার কথা শুনেছি অনেকবার। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সহজ ভঙ্গিতে বলতেন, ‘ব্রাদার, আপনার কাছে আমি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, কিন্তু আমার কাছে আমি শেখ হাসিনার একজন কর্মী। আমি জানি কতটুকু আমার কাজ আর কতটুকু আমার কাজ নয়। সেটা বিবেচনায় রেখেই আমি চলি। তাই কারও কাছে আমি অলস, কারো কাছে আমি কর্মীদের সময় দেই না, কারও কাছে আমি সচিবালয়ে যাই না এমন হাজারো অভিযোগ আমার কানেও আসে। তবে আমি জানি আমার কাজ কতটুকু। ততটুকুই আমি করি।’
দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার বিরুদ্ধে নানা সমালোচনার কথা জানতে চাইলে কিঞ্চিত হেসে তিনি আমাকে বলেছেন, ‘এ বিষয়ে কী বলব? সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যতটুকু দায়িত্ব পালন করার, তা তো করছিই।’ তিনি বলতেন, ‘রাজনীতি কেবল মাঠে-ময়দানেই নয়, রাজনীতির অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। রাজনীতি করার জায়গাটিও অনেক প্রশস্ত।’ তিনি আরো বলতেন, ‘দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সব দায়িত্ব কুক্ষিগত করার পক্ষে আমি নই। রাজনীতি মানে একটি টিমওয়ার্ক। আমি সেটাই করার চেষ্টা করি।’ ২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবর, ২১ বেইলি রোডে তার সরকারি বাসভবনে বসে একান্ত সাক্ষাৎকারে এই কথাগুলো আমাকে বলেছিলেন এখন সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে যাওয়া সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
সংবাদমাধ্যমে কাজ করার সুবাদে অন্য অনেক সাংবাদিকের মতোই প্রায়ই শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে যেতে হয়েছে আমাকেও। দেখেছি, যখনই দলের প্রয়োজন পড়েছে, সামনে চলে এসেছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। কাজ করেছেন দলের জন্য। আজ বিশেষ করে বারবার মনে পড়ছে বেইলি রোডের বাসায় তার একান্ত সাক্ষাৎকার নেওয়ার দিনটার কথা। সেদিন তার সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেদিন একপর্যায়ে তিনি বলছিলেন, যুক্তরাজ্যে থাকাকালে তিনি কীভাবে সক্রিয়ভাবে লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।
পঁচাত্তরের বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পরপরই লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী দীর্ঘ সময় তিনি যুক্তরাজ্যে প্রবাসজীবন কাটান। ১৯৭৬ সালে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বাংলাদেশি পাসপোর্ট বাতিল করে দিয়েছিল তৎকালীন সামরিক সরকার। সে কথাও উঠে আসে ওই দিনের আলোচনায়। তিনি জানান, ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি আবার বাংলাদেশি পাসপোর্ট ফিরে পেয়েছিলেন। যুক্তরাজ্যে থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে প্রবাসীদের সোচ্চার করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। খোলামেলাভাবে এসব কথাও সেদিন আমাকে বলেছিলেন তিনি।
দীর্ঘ প্রবাসজীবন থেকে দেশে ফিরে আসেন ১৯৯৬ সালে। ওই বছরই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আশরাফ। এই সময়ে থেকেই ধীরে ধীরে দলের ভেতর নিজের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেন তিনি। ২০০২ সালে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, এরপর ২০০৯ সালে এবং ২০১২ সালে টানা দুবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফ।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হলে আওয়ামী লীগ দুর্যোগের মুখে পড়ে। সেই সময়ের রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকায় দৃশ্যমান হন তিনি। কারাবন্দি শেখ হাসিনার মুক্তি আন্দোলনকে বেগবান করেন এই নেতা। ওই সময়ে সংস্কারপন্থি নেতাদের কারণে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং দলে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়। তখন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগকে নিশ্চিত ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেন। এরপর ২০০৯ সালের সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা তাকে পুরস্কৃত করেন। দায়িত্ব পান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়েরও। সরকারের শেষ দিকে তাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরপর তাকে দেওয়া হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। অসুস্থ হয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার সময় তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে চাইলেও তা হয়নি, তাকে ছুটি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কে জানত এই ছুটিই তার শেষ ছুটি!
আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলনের কিছু আগে তিনি বলেছিলেন, ‘সম্মেলন মানেই নতুন কিছু করা। সম্মেলন শুধু নেতা নির্বাচন করা নয়। সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়। সবাই-সবাইকে খুব কাছাকাছি দেখতে পান, কথা বলতে পারেন। একটি মেলবন্ধন ঘটে। নতুন সংকল্প নেওয়া হয়।’ যতবারই তার কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, ততবারই খুব সহজ-সরল কথায় একজন প্রজ্ঞাবান রাজনীতিকের ব্যক্তিত্ব দেখতে পেয়েছি চোখের সামনে। রাজনীতিকদের প্রথাগত কথাবার্তা-আচরণের বাইরে একটা অন্য মানুষকে দেখতে পেয়েছি তার ভেতর। টানা দুবার দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কোন কাজটি করতে পেরে আত্মতৃপ্তি পেয়েছেন জানতে চাইলে সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, ‘দুবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কাজের ক্ষেত্রে আমার আইডিয়াকে বাস্তবায়ন করার সুযোগ দিয়েছেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। তাই আমি কাজের স্পিরিট পেয়েছি। এর ফলে দলের মধ্যে কোনো বিভাজন তৈরি হয়নি। সবার কাজ করার স্পেস তৈরি হয়েছে। দলে এখন রাজনীতি আছে। এটাই আমার তৃপ্তি।’
রাজনীতি ও রাজনীতিকদের সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘রাজনীতিকরা দেশকে দিতে আসেন, নিতে আসেন না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের জন্য, মানুষের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। সপরিবারে জীবন দিয়েছেন। জাতীয় চার নেতা কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে জীবন দিয়ে গেছেন। তারা আপস করেননি। মহান মুক্তিযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ জীবন দিয়েছে।’
সবাই আপনাকে দলের ‘ক্রাইসিস টাইম ম্যান’ হিসেবে মনে করে, আপনার ভেতরে জাদুকরী এমন কী আছে যে সবাই এটা ভাবে- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, “কোনো ‘ক্রাইসিসে’ আমি বিচলিত হই না। শান্তি, সৃজনশীলতা, ক্রিয়েটিভিটি আমি পছন্দ করি। তাই যে কোনো ক্রাইসিস মুহূর্তে আমার ভেতরে এগুলোর সম্মিলন ঘটে, আর উতরেও যাই।” সৈয়দ আশরাফের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা ও মেধার ভূয়সী প্রশংসা করেন শেখ হাসিনা নিজেই। আস্থা-বিশ্বাসের জায়গাতেও সৈয়দ আশরাফের যেন দ্বিতীয় বিকল্প নেই শেখ হাসিনার কাছে। দলীয় সভাপতির কাছে সৈয়দ আশরাফের এ অবস্থানের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণও রয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর মতে, এর প্রধান তিনটি কারণ হলো- ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করা, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ক্ষেত্রে তার রণকৌশল ও কর্মতৎপরতা আর আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দলের ও সরকারের হয়ে তার ইতিবাচক ভূমিকা।
শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামকে ঢাকা থেকে হটানোর ক্ষেত্রে সৈয়দ আশরাফের অবদান ছিল জাদুকরের মতো। একদিকে সেদিন সংবাদ সম্মেলন করে প্রশাসনকে শক্তি জুগিয়েছেন তিনি, অন্যদিকে হেফাজতের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে তার সংবাদ সম্মেলন। শেখ হাসিনা নিজেও ওই দিনের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া সৈয়দ আশরাফের হুমকির পর বলেন, “তাদেরকে আরও ‘সফটলি হ্যান্ডল’ করা যেত না আশরাফ?” জবাবে সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘ওদেরকে ছাড় দেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।’ পরে শেখ হাসিনা সেদিনের জন্য আশরাফের ওপরই ভরসা করেন। আর তাতে সফলও হন তিনি।
এরপর ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সফল করতে শেখ হাসিনা ও আশরাফের রণকৌশলই ছিল প্রধান। আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মতে, নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে দুই শীর্ষ নেতার কৌশলে। এ রকম অসংখ্য ঘটনা সৈয়দ আশরাফ তার প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে উতরেছেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও সফলতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। একজন সাংবাদিক হিসেবে জানি, বিশেষ করে জাতিসংঘের দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সৈয়দ আশরাফ শতভাগ সফলতার পরিচয় দিয়েছেন বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এভাবেই নিজের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং দেশের মানুষের কাছে এক অবিচল আস্থার নাম হয়ে উঠেছিলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
লেখক : দেশ রূপান্তরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক