তরুণ প্রজন্মের ওপর বর্তমানে প্রযুক্তির প্রভাব অনেক বেশি। প্রযুক্তি জীবন সহজ করেছে, তেমনি ক্ষতি করছে মানসিক স্বাস্থ্যের। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক কোনো ক্ষেত্রেই সেই ব্যক্তি সঠিক ভূমিকা রাখতে পারবে না। পদে পদে নিজেকে এবং অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিভিন্ন গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
গবেষকদের মতে, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ভিডিও গেমে বেশি সময় কাটানোর ফলে এখনকার তরুণ সমাজের মুখোমুখি আড্ডায় অনীহা তৈরি হয়েছে। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে একে অপরে তিরস্কার কিংবা অপমানের শিকার হওয়ার কারণেও তরুণদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে দ্য ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ তাদের একটি আর্টিকেলে প্রকাশ করেছে, তরুণদের মানসিক জগতকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে সাইবার বুলিংয়ের (কটূক্তি করা) ঘটনাগুলো। প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে এই বুলিংয়ের ঘটনা বেড়েই চলেছে।
নিদ্রাহীনতা, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ইত্যাদি সমস্যাও তরুণ-তরুণীদের মনে প্রভাব ফেলছে। তরুণরা এক ধরনের ‘হাইপাররিয়েলিটিতে (পরাবাস্তব)’ বাস করছে বলে মনে করছেন আমেরিকান সাইকোলজি অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) গবেষকরাও।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও তরুণদের মানসিক জগতে চলছে নানা উত্থান-পতন। তরুণদের মানসিক সমস্যা প্রকাশ পায় তাদের আচরণের মধ্য দিয়ে। যানবাহনে হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে যাওয়া, বন্ধুদের সামান্য বিদ্রুপ বা কৌতুকও সহ্য করতে না পারা, রাস্তায় রিকশাচালকের সঙ্গে চেঁচামেচি, সুযোগ পেলে কাউকে আক্রমণ করে কটু কথা বলা ইত্যাদি ঘটনা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বিএসএমএমইউর মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রযুক্তির বিকাশের মধ্য দিয়ে জাগতিক অনেক কিছুই বদলে গেছে। এই বদলের সঙ্গে জীবনের ছক, ইচ্ছার কাঠামো বদলেছে। মানুষে মানুষে বেড়েছে প্রতিযোগিতা। বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে বাংলাদেশি তরুণরাও। তরুণদের শুধু শারীরিকভাবে ভালো থাকলে হবে না, মানসিকভাবেও ভালো থাকা জরুরি।’
রোগীর কেস স্টাডি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণরা নিজেরা খুব কম আসে। মা-বাবা যাদের সঙ্গে নিয়ে আসে, তাদের বিরুদ্ধে অভিভাবকের অভিযোগ এরা আত্মকেন্দ্রিক এবং সামাজিক সব কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।
তরুণদের মানসিক রোগের ঝুঁকি সব সময়েই কমবেশি থাকে। কিন্তু পরিবর্তনশীল বিশ্বের নানান উপাদান ঝুঁকিটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। হুট করে রেগে যাওয়া এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে বলে মনে করেন এই ডাক্তার।
তিনি বলেন, ‘বয়সের কারণে একটু অন্যরকম থাকে তরুণরা, এই ভাবনা থেকে তাদের অস্বাভাবিক কাজগুলো আমরা স্বাভাবিক মনে করি। তখন তার মনের অসুখগুলো বাড়তে থাকে। আগে জেনেটিকভাবে পাওয়া ডিজঅর্ডারগুলোর রোগী বেশি ছিল, এখন এসব ডিজঅর্ডারের ব্যাপ্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কাও বেড়ে গেছে।’
ইন্টারনেটের প্রভাবের সঙ্গে অন্যান্য অনেক কারণ যুক্ত হয়েছে বলে মনে করেন ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব। বলেন, ‘সবসময় যে ইন্টারনেট প্রভাব ফেলছে তা নয়, মানুষ এখন তার হাতে ক্ষমতা থাকলে তার প্রজেকশন করে নেতিবাচক ভাবে। রাস্তাঘাটে উচ্চস্বরে নিজের রাগ প্রকাশ কিংবা খারাপ আচরণ করা এগুলো পাওয়ার পলিটিক্সও হতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রফেসর মেখলা সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, তরুণদের মধ্যে নানা ধরনের নৈতিক অবক্ষয় বেড়েছে। তাদের সুন্দর মানসিকতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে অভিভাবকসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা প্রয়োজন। তরুণদের ইন্টারনেটের আসক্তি ড্রাগ এডিকশনের মতোই। পরিবারের সদস্য থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতে শুরু করেছে। তরুণরা মাল্টিপল রিলেশনশিপের মতো অনৈতিক কাজগুলো করছে। কারণ ইন্টারনেটে অ্যানোনিমাস থাকা যায়।’
তিনি অভিভাবকদের দায়িত্বশীল হতে পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘মা-বাবাই অনেক ছোট বয়সে মোবাইল হাতে দিয়ে দিচ্ছে। মোবাইলের বদলে তারা যদি ডেস্কটপ ব্যবহার করে অন্তত বড় স্ক্রিনটা বাবা-মায়ের নজরে থাকবে, কিন্তু সন্তান মোবাইলে কী করছে তা তো খেয়াল করছে না অভিভাবক।’
প্রফেসর মেখলা তার প্রযুক্তি আক্রান্ত এক শিশুরোগী প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার একজন রোগীর বয়স আট বছর। চার বছর বয়সে সে ‘চ্যাটিং’-এর ভাষা শিখে ফেলেছে এবং তার ব্যবহারে অ্যাগ্রেসিভ ভাব চলে এসেছে। ওই শিশুকে তার মা-বাবাই মোবাইল ফোন দিয়েছিলেন এবং তারাই আবার এখন তার মানসিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন।’
তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সামাজিক কাজে সম্পৃক্ত করা গেলেও শিক্ষার্থীরা ভালো কাজে সময় ব্যয় করায় অভ্যস্ত হবে।
