একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্তদের আপিলের শুনানি আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে থমকে আছে। ২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট জামায়াতের সাবেক নেতা মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনের শুনানি শেষ হওয়ার পর আপিল বিভাগে আর কোনো মামলার শুনানি হয়নি। সাজার রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডপ্রাপ্ত অন্তত ২৫ জনের এবং একজনের সাজা বাড়াতে রাষ্ট্রপক্ষের একটি আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আসামিদের আপিল শুনানি হচ্ছে না। ফলে এসব মামলা নিষ্পত্তিও হচ্ছে না। এতে করে ভুক্তভোগী পরিবারদের হতাশা যেমন বাড়ছে, তেমনি তারা সংক্ষুব্ধ ও চিন্তিত। কেননা সাক্ষীদের অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে প্রচলিত আইনে আসামিদের সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই বিচারকরা রায় দিয়েছিলেন। এখন দেশবাসী ও ভুক্তভোগী সবাই এসব আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি দেখতে চায়। আমাদের প্রত্যাশা চলতি বছরের শুরুর দিকেই আপিল বিভাগে এসব আপিলের শুনানি শুরু হবে। এজন্য প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ কামনা করছি আমরা।’
দণ্ডপ্রাপ্তদের আপিল শুনানি দীর্ঘায়িত হওয়ায় সম্প্রতি ধানমন্ডিস্থ তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে হতাশা প্রকাশ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সানাউল হক খান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য যারা এই আইন তৈরি করেছিলেন বা যারা বিচারপ্রত্যাশী তারা চাইছিলেন মামলাগুলো দ্রুতই নিষ্পত্তি হবে। কিন্তু আপিলে মামলা আটকে থাকলে ওই স্পিরিটটা আর থাকে না। আশার কথা আপিল বিভাগে এখন দুটি বেঞ্চ বসবে। এখন যদি এই মামলাগুলোকে একটু অগ্রাধিকার দেওয়া হয় তাহলে আমাদের আশা এগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।’
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লা, মো. কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী ও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড আপিল বিভাগে বহাল থাকার পর রায় কার্যকর হয়েছে। আরেক জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে আপিল বিভাগের আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় রিভিউতেও বহাল থাকে। এ ছাড়া দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম ও বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুল আলীম আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় মারা যান। সব মিলে আপিল বিভাগে এ পর্যন্ত সাতটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া মুহাম্মদ আবদুস সুবহান, এটিএম আজহার, সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, যশোরের সাখাওয়াত হোসেন, মো. বিল্লাল হোসেন, হবিগঞ্জের মজিবুর রহমান আঙ্গুর মিয়া, মহিবুর রহমান বড় মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা মোবারক হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর রহমান, পটুয়াখালীর ফোরকান মল্লিক, বাগেরহাটের শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার, খান আকরাম হোসেন, নেত্রকোনার আতাউর রহমান ননী, ওবায়দুল হক তাহের, কিশোরগঞ্জের সামসুদ্দিন আহম্মেদ, মোসলেম প্রধান, জামালপুরের মো. সামসুল হক ওরফে বদর ভাই, এস এম ইউসুফ আলীসহ মৃত্যুদণ্ড ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অন্তত ২৫ জনের আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আবদুস সুবহান, এটিএম আজহারুল ইসলাম এবং জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা ও সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মো. কায়সারের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে করা আবেদন গত বছর আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় এলেও শুনানি হয়নি। আর জাতীয় পার্টির (জাপা) সাবেক সাংসদ পিরোজপুরের আবদুল জব্বারকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া আমৃত্যু কারাদণ্ডের পরিবর্তে তার সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এটিও শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
যুদ্ধাপরাধে দণ্ডপ্রাপ্তদের আপিল শুনানি দীর্ঘায়িত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা তো আদালতের ব্যাপার, আদালত যখনই বিষয়টি কার্যতালিকায় আনবেন তখনই শুনানি হবে।’ তিনি বলেন, ‘তাড়াতাড়ি শুনানির জন্য আমরা আবেদন করতে পারি, কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ অন্য মামলা যেগুলো আছে, সেগুলো বিবেচনা করেই তো এগুলো শুনানির জন্য আসবে। এখন আদালত যখন সময়োপযোগী মনে করবেন তখনই শুনানি হবে।’
