বিভিন্ন ধরনের অবৈধ পণ্যের ব্যবসায়ের কারণে সুনাম হারাচ্ছে চট্টগ্রামের শত বছরের প্রাচীন রিয়াজউদ্দিন বাজার। চোরাচালান, মাদক, হুন্ডি আর চোরাই মোবাইল ফোনসেট ব্যবসায়ীদের দাপটে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পড়ছেন ইমেজ সংকটে। মাঝে-মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলে, পরিচালিত হয় ভ্রাম্যমাণ আদালতও। কিন্তু অবৈধ পণ্যের ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় অপরাধীরা।
অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের সঙ্গে গোপন আঁতাত রয়েছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের। তবে পুলিশের দাবি, ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা সহযোগিতা না করলে রিয়াজউদ্দিন বাজারে সফল অভিযান চালানো সম্ভব নয়। নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার মো. শহীদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেখানে অবৈধ ব্যবসা হবে, সেখানে অপরাধীদের ভিড় বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। রিয়াজউদ্দিন বাজার ও তামাকুমন্ডি লেইন খুবই ঘিঞ্জি এলাকা। তাই সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া এখানে অভিযান চালাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। কারণ বাজারে ঢুকলেই কোনো না কোনোভাবে অপরাধীদের কাছে খবর পৌঁছে যায়। তবে অভিযোগ পেলে আমরা ঠিকই ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
অবৈধ ব্যবসা নিয়ে রিয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘সব ব্যবসায়ী চোরাই পণ্যের ব্যবসা করেন না। যারা এ ধরনের ব্যবসা করে তারা সংখ্যায় কম। রিয়াজউদ্দিন বাজারে ১০ হাজার ব্যবসায়ী আছে। এদের প্রত্যেকের পাঁচজন করে কর্মচারী থাকলে প্রায় ৫০ হাজার লোক এখানে কাজ করছে। হাতেগোনা কয়েকজন অপরাধীর কারণে এখানকার ব্যবসায়ী-কর্মচারীরা আতঙ্কে থাকেন।’ অবৈধ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের অনেক কর্মকর্তার সুসম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তামাকুমন্ডি লেইন বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুল খালেক বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ী সমাজ নির্যাতিত, আতঙ্কিত। অনেকে ক্ষমতাসীনদের ব্যবহার করে বাজারে ঢুকছে, নানা অপরাধ করছে, আমরা কিছুই বলতে পারছি না। এদের কারণেই পেশাদার অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে।’ এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
রিয়াজউদ্দিন বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চোরাই মোবাইল, ইয়াবা, স্বর্ণপাচার, হুন্ডি ও রেলের টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িতের সংখ্যা বাড়ছে এখানে। বাজারের জলসা মার্কেট, করিম সুপার মার্কেট, সিডিএ মার্কেট, নালা হকার মার্কেট, রিজোয়ান কমপ্লেক্স ও ইসলাম মার্কেটের বেশ কিছু ব্যবসায়ী চোরাই মোবাইল ও ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু, সৈয়দ নুর, খোরশেদ, সেলিম, বাহার মার্কেটের হাসান, করিম সুপার মার্কেটের হাসান, দোস্ত মোহাম্মদ মানিক, আবুল, হোসেন, আব্বাস, আবসার, জাহাঙ্গীর মোহাম্মদীয় প্লাজার শরীফ সবাই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। নোয়াখালীর বাসিন্দা লিটন থাকতেন লালখান বাজারের বস্তিতে। শুরুতে মোবাইল চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে চলে যান ঢাকায়। রিয়াজউদ্দিন বাজারের জাহাঙ্গীর ও বাহার মার্কেটের হাসানের কাছে ঢাকা থেকে নিয়মিত চোরাই মোবাইল সেট পাঠান লিটন। কুরিয়ার সার্ভিস বা এসি চেয়ার কোচে এসব সেটের কার্টন আসে রিয়াজউদ্দিন বাজারে।
সাতকানিয়ার জাহেদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে শতাধিক কিশোর; যারা ইয়াবা বহন ও বিক্রি করে। আগে ছিলেন ট্যাক্সিচালক। ২০০৬ সালে পাড়ি দেন দুবাইতে। এখন অঢেল বিত্ত-ভৈববের মালিক। ইয়াবার পাশাপাশি নানুপুরের আবু, সাতকানিয়ার জাহেদ, লোহাগাড়ার জাহাঙ্গীর, হাসান, পটিয়ার তাহের ও শওকতসহ প্রায় ২০ জনের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে স্বর্ণ পাচারের ব্যবসা। বাংলাদেশকে স্বর্ণ পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করেন তারা। হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন হয় স্বর্ণ পাচারের টাকা। দুবাই থেকে আসা বারগুলো সড়কপথে সীমান্ত পার হয়ে চলে যায় ভারতে।
নগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানায়, রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক দু’টি চোরাচালান সিন্ডিকেট স্বর্ণপাচারের সঙ্গে জড়িত। একটিতে নেতৃত্ব দেন আবু আহম্মেদ। আরেকটির নেতৃত্বে রয়েছেন হাকিম ও সাত্তার নামে দু’জন। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, অবৈধভাবে বিদেশি যত সিগারেট চট্টগ্রামে আসে, তার বড় অংশের মজুদ হয় রিয়াজ উদ্দিন বাজার। সরেজমিনে দেখা যায়, রিয়াজউদ্দিন বাজারের ২০-২৫টি দোকানে প্রকাশ্যেই বেচাকেনা চলে অবৈধ সিগারেটের। প্রতিটি দোকানে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিদেশি সিগারেট বেচাকেনা হয়। বন্দরের কর্মকর্তা ও পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশে দোকানদাররা এই কাজটি করে থাকেন।
রিয়াজউদ্দিন বাজারে মিলবে রেলের কালোবাজরের টিকিটও। রেলের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য লুৎফুর রহমান জুয়েল টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত দীর্ঘদিন ধরে। তামাকুমন্ডি লেনে স্টাইল কালেকশন নামে জুয়েলের একটি দোকান রয়েছে। এছাড়াও স্টেশন রোডের গ্রিনলাইন কাউন্টারের সুমন, রুস্তম, খাজা টেলিকমের সুমন, সালেহ ম্যানশনের নিহান ট্রেডার্সের সরোয়ার রিয়াজউদ্দিন বাজারে বসেই ব্যবসা করেন রেলের টিকিট কালোবাজারির। এছাড়া বর্তমানে রিয়াজউদ্দিন বাজার ও তামাকুমন্ডিতে নিজেদের ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে অবৈধ ব্যবসা শুরু করেছেন অনেকে। এদের কারও রাজনৈতিক কোনো দলের সদস্যপদ না থাকলেও বাজার দাপিয়ে বেড়ান।
