নতুন সরকারের যাত্রা শুরু

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০১:২০ এএম

টানা তৃতীয় এবং চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার বিকেলে বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ শেখ হাসিনাকে শপথ পাঠ করান।

গতকাল বেলা ৩টা ৩ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দরবার হলে প্রবেশ করার সময় সবাই দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানান। এর কিছু সময় পর রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ দরবার হলে প্রবেশ করেন। হালকা আকাশি রঙের শাড়ি পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দরবার হলে ঢুকেই সবাইকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। জনাকীর্ণ দরবার হল নতুন প্রধানমন্ত্রীকে করতালি দিয়ে বরণ করে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বিকেল সাড়ে ৩টায় রাষ্ট্রপতির অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে শপথ গ্রহণ করেন এবং পরে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার শপথ নেন।

এ সময় বঙ্গভবনের জনাকীর্ণ দরবার হলে প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানাসহ তার পরিবারের সদস্য, সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, জাতীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি, উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। শপথমঞ্চ থেকে নেমে আসার পর শেখ রেহানা প্রথম অভিনন্দন জানান শেখ হাসিনাকে। এরপরই মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা শপথ নেন।

শপথের পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনের মাঠে রাষ্ট্রপতির আপ্যায়নে অংশ নেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও তার স্ত্রী, শেখ রেহানা, সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, দশম জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এ সময় নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবন থেকে জন্য রাজধানীর রাজউক ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে ছিল অসংখ্য মানুষ।

গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অভাবিত জয় পেয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায় আওয়ামী লীগ। পরে রাষ্ট্রপতি তাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। এবারের সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হলে তিনি বাংলাদেশে ২০ বছরের সরকার পরিচালনাকারী প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতি পাবেন। এটা হবে স্বাধীন বাংলাদেশের একটি রেকর্ড। এর আগে বাংলাদেশে যারা সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের কেউই চারবার সুযোগ পাননি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ২১ বছর পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলে শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বিজয়ী হলে ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয়বার শপথ গ্রহণ করেন তিনি।

এর আগে ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনা তিনটি সংসদীয় আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই নির্বাচনের পরই দেশ থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহার করে নেন সাবেক সামরিক একনায়ক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নব্বইয়ে এরশাদ পতনের আন্দোলনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে যুগপৎ নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কাল গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় যাবেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানোর পরই নতুন সরকারের কাজ শুরু করবেন তিনি। বৃহস্পতিবার শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন বলেও ওই কর্মকর্তা জানান।

শপথ নিলেন ২৪ মন্ত্রী, ১৯ প্রতিমন্ত্রী ও ৩ উপমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ এবং এরপর মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও  উপমন্ত্রীদের শপথের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করল নতুন সরকার।

গতকাল বিকেলে বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নতুন মন্ত্রিসভার ২৪জন মন্ত্রী, ১৯জন প্রতিমন্ত্রী এবং তিনজন উপমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের দায়িত্ব গ্রহণের শপথ এবং গোপনীয়তার শপথ পাঠ করান। শপথ গ্রহণের পর তারা দায়িত্ব গ্রহণ ও গোপনীয়তার শপথে স্বাক্ষর করেন।

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিশাল বিজয় লাভ করে। নতুন মন্ত্রিসভায় ২০ জন নতুন মুখ রয়েছেন।

২৪ জন মন্ত্রী হচ্ছেনÑ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার।

১৯ জন প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ে কামাল আহমেদ মজুমদার, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ইমরান আহমেদ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে জাহিদ আহসান রাসেল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে নসরুল হামিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে মো. আশরাফ আলী খান খসরু, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মো. জাকির হোসেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মো. শাহরিয়ার আলম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে জুনাইদ আহমেদ পলক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ফরহাদ হোসেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে স্বপন ভট্টাচার্য, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জাহিদ ফারুক, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে মো. মুরাদ হাসান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে শরীফ আহমেদ, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কে এম খালিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ডা. মো. এনামুর রহমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে মো. মাহবুব আলী এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।

৩ জন উপমন্ত্রী হচ্ছেন- পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বেগম হাবিবুন নাহার, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এ কে এম এনামুল হক শামীম এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মহিবুল হাসান চৌধুরী।

শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব শফিউল আলম। শপথ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিচারপতি, শিক্ষক, কূটনীতিকরাসহ এক হাজারের মতো অতিথি উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গতকাল রবিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের তালিকা প্রকাশ করেন। এই তালিকা অনুযায়ী গতকাল বিকেলে প্রত্যেক মন্ত্রীর বাড়িতে পরিবহন পুল থেকে গাড়ি যায়। ওই গাড়িতে চড়ে মন্ত্রীরা বঙ্গভবনে যান শপথ নিতে।

নতুন মন্ত্রিসভায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী নিজের কাছে  রেখেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত