রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বাংলাদেশের উত্থান এবং উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের শক্তিবৃদ্ধি

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৩৪ পিএম

যদি কেউ শুধুমাত্র কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের নির্বাচনে শেখ হাসিনার বিপুলমাত্রার বিজয় এবং তার বিরোধীদের ভোট জালিয়াতির অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন তাহলে তারা দেশটিতে যে উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে এবং এর যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে তাকে পাশ কাটিয়ে যাবেন। শেখ হাসিনা উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে টানা তৃতীয় মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্ব শুরু করেছেন। ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত তার প্রথম মেয়াদকে হিসাবে আনলে শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়া এবং আরও অনেক অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিণত হয়েছেন।

অনেক আঞ্চলিক নেতৃত্বেরই সৌভাগ্য হয়েছে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার, কিন্তু তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজনই শেখ হাসিনার মতো তাদের জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এমনকি অল্প কয়েকজনই তাদের অঞ্চলকে পুনর্গঠন করার সুযোগ পেয়েছেন। গত এক দশকে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নাটকীয় উন্নতি ঘটেছে। শেখ হাসিনা যে স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন তা এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তার নেতৃত্বে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত-বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হয়েছে। এর জন্য তারা ন্যূনতম উন্নয়নশীল দেশের তকমা কাটানোর পথে। শেখ হাসিনার লক্ষ্য বাংলাদেশ ২০২১ সালে যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে বর্তমান ৭% থেকে ১০% এর কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক রূপান্তর কি সমগ্র উপমহাদেশের জন্য প্রযোজ্য? প্রথমত, এটি পাকিস্তানকে দ্বিতীয় স্থান থেকে সরিয়ে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ক্ষমতার যে উচ্চবর্গ গড়ে উঠেছিল তাকে পরিবর্তন করা শুরু করেছে। বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ১৮০০ ডলার, যা পাকিস্তানের ১৬০০ ডলারের চেয়ে বেশি। দেশটির সামষ্টিক জিডিপি ২৭৫০ কোটি ডলার যা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানের ৩১০০ কোটি ডলারকে অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা করা যায়।

নিছক সংখ্যার চেয়ে বড় বিষয় হলো নির্দেশনা, প্রেরণা এবং জাতীয় অভীষ্ট লক্ষ্য। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ব্যাপারে যে আন্তর্জাতিক সংশয় কাজ করছে তার বিপরীতে ঢাকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদ রয়েছে। যদি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দেশটির অর্থনীতিতে আরেকটি বেলআউটকে প্রতিহত করার জন্য সারা বিশ্বে ভ্রমণ করে বেড়ান, তাহলে শেখ হাসিনা শিল্প এবং বিনিয়োগে যে সহায়তা আসে তার ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা বলতে পারেন।

বাংলাদেশের এই রূপান্তর পাকিস্তানের কিছু দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করছে। যে প্রচলিত অনুকম্পা পাকিস্তান বাংলাদেশকে প্রদর্শন করত তার স্থলে তা এখন প্রশংসায় রূপান্তরিত হয়েছে। পাকিস্তানে এখন বেশ কিছু লোক ইসলামাবাদকে ‘বাংলাদেশ মডেল’ গ্রহণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন যেখানে রাজনৈতিক হঠকারিতার চাইতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এবং কট্টরপন্থার চাইতে ধর্মীয় সংযমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অবশ্য, পাকিস্তানে এই ধরনের পরিবর্তন কেউ আশা করতে পারে না। কেননা এর সামরিক এবং বেসামরিক নেতৃত্বের নীতিতে এই সব পরিবর্তন আনা খুবই কঠিন যা দেশটি দীর্ঘসময় ধরে মেনে নিয়ে আসছে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের এই উত্থানের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ভরকেন্দ্র অঞ্চলটির পূর্বদিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি উপমহাদেশের সমগ্র পূর্বাঞ্চলের উত্তরণে সহায়তা করছে, বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বের ভুটান এবং নেপাল এই উত্তরণে শামিল হয়েছে। ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ উভয়েই দক্ষিণ এশিয়া এবং এর সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলের ক্ষেত্রে সেতুবন্ধনের রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান করছে। রাওয়ালপিন্ডি তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতার পথকে বেছে নিয়েছে, সেক্ষেত্রে ঢাকা আঞ্চলিক সহযোগিতার পথকেই শ্রেয় মনে করে।

গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি সার্ক গঠনে ঢাকার উদ্যোগ বড় ধরনের সহায়তা করেছিল। বর্তমানে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সহযোগিতার অসম্মতিতে সার্ক অকার্যকর রয়েছে। এখন পাকিস্তানকে সমালোচনা করার চাইতে আমাদের অবশ্যই সার্বভৌম পছন্দকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা ইসলামাবাদ করছে। পাকিস্তানের এই পছন্দের অপ্রত্যাশিত পরিণামকে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত এবং নেপালের মধ্যকার পূর্ব উপমহাদেশীয় উপআঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে পূরণ করা যাচ্ছে। তাই পাঁচটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশ (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা) এবং দুইটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ (মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ড) আঞ্চলিক সহাযোগিতা আরও বৃদ্ধি করতে বিআইএমএসটিইসিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

বেইজিং তার ইউনান প্রদেশের সঙ্গে মিয়ানমার, বাংলাদেশ এবং পূর্ব ভারতের সংযুক্তির যে পরিকল্পনা করছে তা সফল করার জন্য বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের মতো তথাকথিত বিসিআইএম করিডরের উন্নয়নের ব্যাপারটি মসৃণ নয়। কেননা এক্ষেত্রে ভারত তার সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন এবং আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। সন্দেহ নেই, রোহিঙ্গা ইস্যু পূর্বাঞ্চলের আঞ্চলিকতাবাদের ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে কালো ছায়া তৈরি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যে প্রবৃদ্ধি এবং তিন অর্থনৈতিক পরাশক্তিÑ চীন, ভারত এবং আসিয়ানের যে ভার, তা আঞ্চলিকতাবাদের শর্তগুলোকে শক্তিশালী করছে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে যে সমুদ্রসীমাগত বিষয় ছিল তা শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা করার জন্য দেশটিকে ধন্যবাদ। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে সুমদ্রসীমাগত অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তার যে সহযোগিতার বিষয় ছিল তার জন্য একটি প্রশস্ত পথ উন্মুক্ত হয়েছে। এর জন্য উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ আরও শক্তিশালী ও জোরদার হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূগোলে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কই প্রাধান্য পেত। দক্ষিণ এশিয়ার ভাবমূর্তি তখন খুবই নেতিবাচক ছিল। যেমন, এই অঞ্চল সম্পর্কে ‘পারমাণবিক প্রান্ত’, ‘সবচাইতে বিপজ্জনক স্থান’ এবং ‘ন্যূনতম সংযোগের অঞ্চল’ ইত্যাদি তকমা সারা বিশ্বে প্রচলিত ছিল।

নিশ্চিতভাবে, পাকিস্তান এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নেতিবাচক। এটি একটি চ্যালেঞ্জ, কিন্তু তাকে অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের উত্থান এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি আমাদের উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের জন্য একটি ইতিবাচক ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে সহায়তা করছে এবং তার সঙ্গে শক্তিশালী পূর্ব এশিয়া অঞ্চল সংযোগও আমরা আশা করছি।

লেখক
সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর : অনিন্দ্য আরিফ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত