কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরঘেঁষে বেসরকারি শিল্প এলাকা কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনের (কেইপিজেড) অনুকূলে জমির নামজারি ঝুলে
থাকায় বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ। জমির মালিকানার দলিল নিয়ে সন্তুষ্ট না হওয়ায় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও বহুজাতিক কোম্পানি স্যামসাং কেইপিজেডে শিল্পকারখানা স্থাপন না করে ভিয়েতনামে বিনিয়োগ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষার শর্তে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইয়াংওয়ান কর্পোরেশনকে আনোয়ারার দেয়াং পাহাড় এলাকায় ২ হাজার ৪৯২ একর অ-কৃষি জমি শিল্প গড়ে তোলার জন্য কেইপিজেডের নামে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেয় সরকার। দশ বছর ধরে ভূমির উন্নয়নকাজ চলার পর ২০১১ সালে এই শিল্পাঞ্চলে ইয়াংওয়ান শিল্পগোষ্ঠীর অধীনে কর্ণফুলী সু’জ জুতা উৎপাদন শুরু করে। চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) সবচেয়ে বড় পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানটি ইয়াংওয়ান কর্পোরেশনের।
পরিবহন ও যোগাযোগের দিক থেকে খুবই সুবিধাজনক চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে এ রকম আকর্ষণীয় জায়গায় বিদেশিরা বিনিয়োগ করতে চাইলেও নামজারি না হওয়ায় জমির মালিকানা হস্তান্তর করতে পারছে না। এ কারণে অনেক সম্ভাব্য বিনিয়োগ ফিরে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। উপায় না দেখে কেইপিজেড কর্র্তৃপক্ষ নিজের অর্থায়নে খালি জায়গায় নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে তুলছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ মাসেই দুই কোটি ডলার ব্যয়ে নতুন তিনটি কারখানা চালু হচ্ছে। গত শনিবার সরেজমিনে কেইপিজেড দেখে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ সব তথ্য পাওয়া যায়।
কেইপিজেডের সহ-মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. মুশফিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বন্দর সুবিধা, অবকাঠামোগত দিক ও পরিবেশ বিচারে কেইপিজেড সবচেয়ে আদর্শ ও আকর্ষণীয় রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল হওয়ার পরেও মিউটেশন (নামজারি) না থাকায় আমরা বিদেশি বিনিয়োগ হারাচ্ছি। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। আমাদের কাছে বাইরের বিনিয়োগকারীরা এসেও
ফিরে যাচ্ছে। স্যামসাং এসেও ফিরে গেল ভূমির মিউটেশন নাই জেনে। এখানে একশ একরের একটি শিল্প প্লটে ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনে তাদের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ পরিকল্পনা ছিল।
আইটি পার্ক স্থাপনের জন্য একশ একর জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে উচ্চ প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাব প্রকট। তাই বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষায় আছি। এই শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুতের সমস্যা নেই, এলএনজি আসায় গ্যাস সংকটও শিগগির কেটে যাবে। কিন্তু এই মিউটেশনের কারণে আমরা তা (বিদেশি বিনিয়োগ) পাচ্ছি না। এক্ষেত্রে সরকারের সু-বিবেচনা আশা করছি। কিন্তু মিউটেশনের জন্য আমরা বসে নেই। নিজেরাই বিনিয়োগ করছি। ইয়াংওয়ান কর্পোরেশন আগামী তিন বছরের মধ্যে খালি প্লটগুলোতে কারখানা বসানোর কাজ শেষ করবে। তখন কেইপিজেডে সরাসরি এক লাখ লোকের এবং পরোক্ষ আরও দুই লাখের কর্মসংস্থান হবে।’
কেইপিজেডের আইন ও ভূমি বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেন জানান, এই শিল্পাঞ্চলে মোট ২৪টি কারখানায় ২১ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। বছরের মধ্যবর্তী সময়ে আরও তিনটি কারখানা চালু হলে নতুন করে ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ নারী শ্রমিক। শ্রমিক কর্মচারীর জন্য রয়েছে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার, আছে চাইল্ড কেয়ার সেন্টারও।
কেইপিজেডে উৎপাদিত শিল্পপণ্য ও রপ্তানি বাজার নিয়ে এজিএম মুশফিকুর বলেন, এই শিল্প জোনে চালু কারখানাগুলোতে উৎপাদিত বিভিন্ন নামিদামি ব্রান্ডের জুতা, তৈরি পোশাক ও পেডিং, টেক্সটাইল পণ্য ইউরোপ ও আমেরিকায় রপ্তানি হচ্ছে। ২০১৮ সালে এখান থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ২০ কোটি ডলার।
তিনি বলেন, শিল্পাঞ্চলের পশ্চিম পাশে কর্ণফুলীর তীরে ৩৯০ মিটার দীর্ঘ একটি জেটি নির্মাণের প্রস্তাব চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ব্যাপারে বিদেশি একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা সমীক্ষা প্রতিবেদন বন্দর কর্র্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করা হয়েছে। এই জেটি নির্মিত হলে নিকটবর্তী চায়না ইকোনমিক জোনও এটি ব্যবহার করতে পারবে বলে জানান তিনি।
মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘এমন পরিবেশবান্ধব শিল্প জোন বাংলাদেশে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ায়ও আরেকটি নেই। এখন ভারতসহ কিছু দেশ কেইপিজেডকে ‘মডেল’ হিসেবে ধরে নিয়ে আমাদের আইডিয়াকে শেয়ার করে নিচ্ছে।’
তিনি জানান, কেইপিজেডের পরিবেশ সুরক্ষা ও উন্নয়নে পরিবেশবিদ এ কে এম আশরাফের নেতৃত্বাধীন একটি আলাদা পরিবেশ বিভাগ রয়েছে। সেখানে ১৫০ জন কর্মী এই কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। মোট ভূমির ৪৮ শতাংশ শিল্পকারখানার জন্য রেখে বাকি ৫২ শতাংশ জায়গা উন্মুক্ত ও সবুজায়নের (গ্রিনফিল্ড) জন্য রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষায় ৩৩ শতাংশ ভূমিতে বনায়ন এবং ১৯ শতাংশ ভূমিতে জলাধার ও ১৮ গর্তের একটি গল্ফ কোর্ট তৈরি করা হয়েছে।
প্রায় ১৩৫ একর জায়গাজুড়ে ১৮টি লেক (জলাধার) তৈরির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শুরুতে এলাকাটি ছিল শুষ্ক ও মরুময়। এখন এই লেকগুলো শিল্পাঞ্চলসহ আশপাশের জনবসতির পানির চাহিদা মেটাচ্ছে। হাজার হাজার পরিযায়ী শীতের পাখি বিচরণ করছে। ২০১৭ সালে শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য ও দূষিত পানিশোধনের জন্য সেখানে চালু করা হয়েছে ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট)।
মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘এ পর্যন্ত এই শিল্পাঞ্চলে ২১ লাখ গাছ রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে টিকে গেছে ১৫ লাখের বেশি। এসব গাছ-বৃক্ষ-তরুলতা এখন অনেক বাড়ন্ত, যা এই শিল্পাঞ্চলের শোভা বাড়িয়েছে। যে কারণে মানুষের চাহিদ মেটাতে এখানে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি ‘পিকনিক স্পট’ও রাখা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গোলাপ, গাঁদাসহ নানা রং-বেরঙের ফুলে ছাওয়া শিল্পাঞ্চলটিতে হাজার হাজার সেগুন, মেহগনি, গর্জন, একাশিয়া গাছে ছাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ সড়ক ও কারখানা ঘিরে ফলদ বৃক্ষরাজি ও নারিকেল বীথির হেলদোলে মুগ্ধতা ছড়ানো আবাহন।
