তমব্রু নো-ম্যানস ল্যান্ডে বাঁধ নির্মাণ করছে মিয়ানমার ,

রোহিঙ্গাদের সরাতে নতুন ফাঁদ!

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৩:০৮ এএম

নাইক্ষ্যংছড়ি তমব্রু কুনারপাড়া নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের সরাতে ফাঁদ তৈরি করছে মিয়ানমার। তমব্রু খালে ব্রিজের নামে একটি বাঁধ নির্মাণ করছে তারা। এতে আগামী বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বাংলাদেশ অংশে প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক বলছেন, বিষয়টি নজরে এসেছে এবং এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হচ্ছে।

তমব্রু নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাংলাদেশিরা বলছেন, ‘মিয়ানমার তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের তাড়াতে নতুন করে পাঁয়তারা শুরু করেছে মিয়ানমার সরকার। কারণ, কোনো ধরনের রাস্তা নেই এমন একটি জায়গায় ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজন নেই। এটি নামেমাত্র ব্রিজ নির্মাণ। আগামী বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের পানি আটকে দিয়ে তমব্রু সীমান্তে খালের পাশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সরাতে এমনটি করছে মিয়ানমার সরকার। এর আগেও তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সরাতে নানা চক্রান্ত করেছিল মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। সীমান্তে দেশটির অভ্যন্তরে ঘন ঘন গুলিবর্ষণ, রাতে কাঁটাতার ঘেঁষে অতিরিক্ত  সৈন্য সমাবেশসহ নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছিল।

বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যকার সীমান্তপথ রয়েছে ২৭১ কিলোমিটার। এরমধ্যে ২০৮ কিলোমিটার স্থলপথ ও ৬৩ কিলোমিটার জলসীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি কুনারপাড়া সীমান্তে তমব্রু খালের পাশ ঘেঁষে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রয় নেয় প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের নির্যাতনের শিকার এসব রোহিঙ্গা খালের পারে গড়ে তুলে একটি ছোট রোহিঙ্গা বস্তি। নো-ম্যানস ল্যান্ডে রোহিঙ্গা বস্তি গড়ে ওঠার পর থেকে মিয়ানমার সরকারের সব দৃষ্টি এই রোহিঙ্গা বস্তির ওপর।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়ে এই নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছি দেড় বছর আগে। এরপর থেকে মিয়ানমার সরকার এই নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে আমাদের সরানোর জন্য নানা ভয়ভীতি দেখিয়েছে। এবার নতুন করে চক্রান্ত শুরু করেছে তারা। তমব্রু খালে ব্রিজ নির্মাণের নামে বাঁধ দিচ্ছে মিয়ানমার সরকার। এতে করে আগামী বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে সব রোহিঙ্গা এখানে মরবে। আমি বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহলের সাহায্য কামনা করছি।’

ওই ক্যাম্পে অবস্থানরত আরেক রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আরিফ বলেন, আবারও নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে রোহিঙ্গাদের সরাতে নতুন পাঁয়তারা শুরু করেছে মিয়ানমার। যে কারণে তমব্রু খালে নতুন করে তৈরি করছে ব্রিজের নামে বাঁধ। এটি হলে খালে পানির স্বাভাবিক চলাচল বিঘœ ঘটবে এবং বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনারপাড়াসহ কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাবে।’

নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে বসবাসরত স্থানীয় অধিবাসী নুরুল আবছার জানান, ‘নো-ম্যানস ল্যান্ডের মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যে ব্রিজটি নির্মাণ করছে তাতে মনে হয় কোনো সড়কের জন্য নির্মাণ করছে না। শুধু মাত্র তমব্রু খালে ব্রিজ নির্মাণ করার প্রয়োজন নেই। মূলত আগামী বর্ষা মৌসুমে খালের পাহাড়ি ঢলের পানি আটকে দিয়ে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের সরানোর পাঁয়তারা শুরু করছে। এতে করে শুধু রোহিঙ্গারা সরবে না, আমরা যারা বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছিÑ আমরাও সবাই পানিবন্দি হয়ে পড়ব। পরিস্থিতি এ অবস্থায় থাকলে প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়বে।’

ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘কোনো রাস্তা নেই, অথচ তমব্রু খালে ঘন ঘন পিলার বসিয়ে একটি ব্রিজ নির্মাণ করছে মিয়ানমার। এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে হলেও তমব্রু খালটি অধিকাংশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এ কারণে আগামী বর্ষায় পুরো গ্রামটি পানিবন্দি হয়ে পড়বে। এমনকি আমার নিজের বাড়িও থাকবে না। আমার মনে হয়, নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সরাতে মিয়ানমার এই ফন্দি করছে। এতে করে আমরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হব।’

এ ব্যাপারে জানতে কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল মনজুরুল হাসান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘তমব্রু খালে নতুন করে ব্রিজ নির্মাণের বিষয়টি এরই মধ্যে আমি জেনেছি। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।’

উল্লেখ্য, গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংস ঘটনার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়। তবে অল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়ে এবং সেখানেই আশ্রয় শিবির তৈরি করে অবস্থান নেয় তারা। ওই বছরে নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম সীমান্ত পয়েন্টে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সরকার নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে সরিয়ে উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে আসে। তবে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অন্তত আরও ৫ হাজার রোহিঙ্গা এখনো অবস্থান করছে। কিন্তু, মিয়ানমার সরকার নো-ম্যানস ল্যান্ডের এই ভূমি তাদের দাবি করে সেখান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেয় এবং একই সঙ্গে নানা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে যাতে করে রোহিঙ্গারা সরে যায়। কিন্তু রোহিঙ্গা সরে না গিয়ে এই নো-ম্যানস ল্যান্ডেই অবস্থান করছে। এসব রোহিঙ্গাকে বর্তমানে চিকিৎসাসহ মানবিক সহায়তা দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন, বিজিবি, রেডক্রস ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত