বাংলাদেশের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংক করপোরেশনের (আরসিবিসি) সাবেক কর্মকর্তা মায়া সান্তোস দেগিতোকে মুদ্রাপাচারের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করেছে দেশটির একটি আদালত। দেশটির
মাকাতি আঞ্চলিক আদালত গতকাল বৃহস্পতিবার এই রায় দেয় বলে সিএনএন ফিলিপাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মুদ্রাপাচারের আটটি অভিযোগের প্রতিটিতে বিচারক দেগিতোকে ৪ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। পাশাপাশি তাকে ১০ কোটি ৩০ লাখ ডলার জরিমানার আদেশও দিয়েছে আদালত। বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া তিন বছর আগের ওই চুরির ঘটনায় এই প্রথম কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হলো। রিজল ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা দেগিতোই ছিলেন এ মামলার একমাত্র আসামি। তার সহায়তায় উত্তোলনের পর কয়েক লাখ ডলার অর্থ চারটি অজ্ঞাত ও ভুয়া ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়েছিল বলে আদালত দেগিতোকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে অনেকগুলো ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। এর মধ্যে একটি বার্তার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় একটি ‘ভুয়া’ এনজিওর নামে দুই কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা বানান ভুলের কারণে আটকে যায়।
আট কোটি ১০ লাখ ডলার চারটি বার্তার মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয় ফিলিপাইনের মাকাতি শহরে রিজল কমার্র্শিয়াল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখায়। সে সময় ওই শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন দেগিতো। তবে অর্থপাচারে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে দেগিতো সিনেটের শুনানিতে বলেছিলেন, আরসিবিসির উঁচু পর্যায়ের নির্দেশেই তিনি কাজ করেছেন। ঘটনার পর আরসিবিসির প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো তা ও নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট রাউল ভিক্টর তান পদত্যাগ করেন।
মাকাতির আদালত বলেছে, ঘটনার সময় দেগিতো আরসিবির জুপিটার শাখার দায়িত্বে ছিলেন। তাই ঘটনার দায় তার এবং মুদ্রাপাচার প্রতিরোধ আইন লঙ্ঘনের জন্য অপরাধমূলকভাবে দায়ী। আদালত আরো বলেছে, তার খালাসের পক্ষে উত্থাপিত দাবির পক্ষে স্পষ্ট ও সন্দেহাতীত প্রমাণ নেই। দেগিতোর আইনজীবী বলেন, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। তা ছাড়া এখন জামিনে থাকায় তিনি কারাগারের যাবেন না।
ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই সাইবার জালিয়াতির ঘটনা জানাজানি হলে ২০১৬ সালে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মানুষ বিষয়টি জানতে পারে ঘটনার এক মাস পর মার্চে, ফিলিপাইনের একটি পত্রিকার খবরের মাধ্যমে। বিষয়টি চেপে রাখায় সমালোচনার মুখে গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন আতিউর রহমান; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে আনা হয় বড় ধরনের রদবদল।
ফিলিপাইনে যাওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলরেম মানি রেমিট্যান্স কোম্পানির মাধ্যমে চলে যায় তিনটি ক্যাসিনোর কাছে। জুয়ার টেবিলে হাতবদল হয়ে ওই টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে, তার হদিস আর মেলেনি। এর মধ্যে একটি ক্যাসিনোর মালিকের কাছ থেকে দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করে বাংলাদেশ সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও বাকি অর্থ উদ্ধারে এখনো তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ ফিলিপাইনে ঢোকার বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে দেশটির সিনেট কমিটি তদন্ত শুরু করে। ওই ঘটনায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার পর আরসিবিসি তাদের শাখা ম্যানেজার দেগিতোকে বরখাস্ত করে। আর ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাপাচার ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় এক কোটি ৯১ লাখ ডলার জরিমানা করে আরসিবিসিকে।
