বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শিশুরা হাসুক, শিশুরা খেলুক

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:২৬ পিএম

ভোর সকালে সূর্যের মুখ দেখা যেতে না যেতেই ছেলেমেয়েরা একগাদা বই কাঁধে করে হয় স্কুলের দিকে নয় কোচিং সেন্টারের দিকে ছোটে। সারা দিন ক্লাসশেষে তারপর ঘরে ফেরা। অনেকের কপালে এই সৌভাগ্যটুকুও জোটে না। স্কুলশেষে অনেক ছেলেমেয়েই প্রাইভেট বা কোচিংপানে ছোটে। মনে হয় যেন এই শিশুদের দুনিয়াও শুধু ছোটাছুটির জন্য! অবসর কিংবা সামান্য বিনোদনও তাদের জোটে না। খেলাধুলার একটুখানি সুযোগ পাওয়া তো বহু দূরের ব্যাপার!

এখনকার শিশুদের একটা বড় অংশই পড়াশোনার চাপে পিষ্ট হয়ে খেলার মাঠে গিয়ে ছোটাছুটি-লুটোপুটি করার সুযোগও পায় না। আর অবস্থা এমন হয়েছে যে, অনেকে খেলাধুলাকে পাশ কাটিয়েই চলে। ভাবটা এমন যে, খেলাধুলা করে হবেটা কী! তার চেয়ে বরং মোবাইলে একটু গেম খেলা কিংবা একটু টেলিভিশন দেখাও ভালো! এভাবে স্মার্টফোন এবং আকাশসংস্কৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মকে এক প্রকার ‘বন্দি মানসে’ আটকে ফেলছে।

এখনকার শিশুদের অনেকেই খেলাধুলা-বিমুখ হয়ে বেড়ে উঠছে। আকাশসংস্কৃতির কারণে মাঠের সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের যোগ নেই। এমন হওয়ার পেছনে আমাদের অভিভাবকদের দায় কিন্তু কম নয়। মা-বাবা তাদের সন্তানদের নিজেদের কাছ থেকে দূরে রাখার জন্যই মূলত তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেন। এভাবে ধীরে ধীরে যে শিশু স্মার্টফোনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে তাদের পক্ষে এটা থেকে দূরে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এটা যখন তাদের কাছে নেশায় পরিণত হয়, তখন তাদের ফেরাবে এমন সাধ্য কার? অথচ শিশুর শারীরিক এবং মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আমরা কীভাবে অস্বীকার করব? আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, খেলাধুলা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষভাবে সাহায্য করে। মানুষের শরীর কাঠামোকে মজবুত করে গড়ে তোলে। আমরা নিশ্চয় আমাদের সন্তানদের অতিশয় দুর্বল হিসেবে দেখতে চাই না! তাহলে শিশুদের খেলার মাঠে পাঠাতে বাঁধা কোথায়? প্রতিদিন বিকেলে এক ঘণ্টা কিংবা তার চেয়ে সামান্য বেশি সময় খেলাধুলার পেছনে ব্যয় করলে কোনো ক্ষতি হয় না, বরং সতেজ শরীর এবং মন নিয়ে পড়ার টেবিলে বসতে পারে শিশুরা। আফসোস! বিষয়টি নিয়ে আমরা একেবারেই বেখবর।

শৈশবে স্কুল থেকে ফিরে এসে বাড়িতে বই রেখে সামান্য কিছু মুখে দিয়েই খেলার মাঠে ছুটে যেতাম। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডিসহ অনেক খেলাই চলত সমানতালে। কই পরীক্ষার সময় তো কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখিনি! বরং যেসব ছেলেমেয়ে খেলাবিমুখ ছিল, দিনদিন তাদেরই পিছিয়ে পড়তে দেখেছি। প্রবলভাবে খেলার মাঠের অভাব আমাদের দিনদিন খেলাধুলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। আবার সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে খেলাধুলাকে অন্তর্ভুক্ত না করার ফলেও খেলাধুলা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান একেবারে শূন্যই থেকে যাচ্ছে। সত্যি কথা বলতে কি, মাঠের অভাব বলি, কিংবা সমাজে চর্চার অভাব, খেলাধুলার একটা বড় অংশই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। হাডুডু যে আমাদের দেশের জাতীয় খেলা এটা কে না জানে! ক্লাস ওয়ানে পড়ুয়া শিশুটিও জানে আমাদের জাতীয় খেলা কী। অথচ এই প্রজন্মের শিশুদের যদি খেলাটি সম্পর্কে আরেকটু বেশি প্রশ্ন করা হয়, তাহলে তারা জবাব দিতে পারবে না। যে খেলাটিকে তারা কখনো নিজ চোখে দেখেনি তার বর্ণনা তারা কীভাবে দিতে সক্ষম হবে? এটা আমাদের জন্য অবশ্যই লজ্জার বিষয় যে, আমাদের জাতীয় খেলা হাডুডুও আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ আমাদের দায়িত্ব ছিল একে ভালোমতো চর্চায় রেখে সংরক্ষণ করা।

ছোটবেলায় প্রতিটা স্কুল-কলেজে মহা ধুমধামের সঙ্গে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে। যে স্কুল বা কলেজে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো তার আশপাশের এলাকায় একটা সাজ সাজ রব পড়ে যেত। মানুষ দলে দলে ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা দেখতে ছুটে আসত। এখন গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হলেও শহরের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এসব প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় না। হবে কীভাবে! স্কুলগুলোতে যে খেলার মাঠই নেই! নির্মম সত্য হলো, ধীরে ধীরে দেশে খেলার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। অথচ উচিত ছিল জনসংখ্যা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুপাতে খেলার মাঠের সংখ্যা বাড়ানো। কিন্তু তা হয়নি। গ্রামাঞ্চলে কম হলেও কিছু কিছু খেলার মাঠ আছে। কিন্তু শহরের অবস্থা একেবারেই বেহাল। অপরিকল্পিত নগরায়ন শহরের বুকের এক চিলতে খেলার মাঠকেও গিলে খেয়েছে। খেলাধুলার সামান্য জায়গাও অবশিষ্ট নেই। তাহলে কীভাবে আমাদের দেশ থেকে তৈরি হবে একজন পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি কিংবা ব্রায়ান লারার মতো সেরা খেলোয়াড়!

খেলাধুলার উপকারিতা নানাবিধ। খেলাধুলা শিশুদের নেতৃত্বের ক্ষমতা বাড়ায়। শিশুর নেতৃত্ব বিকশিত করতে হলে শিশুকে অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে দিতে হবে। এ জন্য অবশ্যই আপনার শিশুকে খেলার মাঠে পাঠাতে হবে। খেলাধুলার মধ্যে আত্মনিবেদিত ছেলেমেয়েরা অন্য কোনো বাজে কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ কম পায়। ফলে বাবা-মায়ের জন্যও এটা স্বস্তির একটা কারণ বলে বিবেচিত হতে পারে। এখনকার তরুণ-তরুণীরা ব্যাপকভাবে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের ভয়াবহতা দেখে মাঝেমধ্যেই ভয়ে শিউরে উঠতে হয়। কোনদিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম? অথচ তরুণদের যদি খেলাধুলার প্রতি উৎসাহী করা যায়, তাহলে মাদকের ভয়াবহতা কিছুটা হলেও কমবে। শুধু মাদক কেন- অশুভ যেকোনো কিছুর মোকাবিলার জন্য খেলাধুলা হয়ে উঠতে পারে শক্তিশালী হাতিয়ার। আজকাল খেলাধুলা শুধুমাত্র বিনোদন নয়, খেলাধুলার মাধ্যমে বিশ্ব পরিমণ্ডলে নিজেদের পরিচিত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তাহলে আমরা কেন খেলাধুলায় ভালো করার মাধ্যমে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরব না?

শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে খেলাধুলায়ও বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে। তাহলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই স্কুলে স্কুলে খেলাধুলার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সুস্থ-সবল জাতি গঠনের জন্য খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের নিরস পাঠের চেয়ে আনন্দের মাধ্যমে যদি পাঠদান করা যায় তাতে অসুবিধা কী? পড়াশোনাকে প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য করার জন্য সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার আয়োজন করা একান্ত জরুরি।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত