কাজের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য দেশটি ক্রমেই আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা ঘটনায় বাংলাদেশিদের জন্য দেশটি পরিণত হচ্ছে ‘মৃত্যুকূপে’। গত বছর দেশটিতে অন্তত ১৫০ বাংলাদেশি খুন হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় তিনজন করে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব হত্যাকাণ্ডের সঠিক কারণ জানা না গেলেও অভিবাসীরা জানান, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতিসহ নানা ঘটনার শিকার হয়ে দেশটির কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মম ভাগ্যবরণ করছেন বাংলাদেশিরা। যার বড় একটি অংশ ২০ থেকে ৩০ বছরের তরুণ। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং অভিবাসন নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজনের দেওয়া তথ্যমতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিবছর গড়ে ২০০ বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। গত বছর হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ৫৬ বাংলাদেশি। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১৮টি। দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৫৩৩টি।
অভিবাসীরা জানান, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির অভিযোগে গত ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর বিদেশিদের দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় জোহানেসবার্গ সংলগ্ন সোয়েটো এলাকার কৃষ্ণাঙ্গরা। এ ঘটনায় বাংলাদেশিসহ অন্তত এক হাজার ৫০০ বিদেশির দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনা চলাকালে চার কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হলে ‘সেভ অ্যান্ড ক্লিন সাউথ আফ্রিকা’ নামে একটি সংগঠন সব বিদেশিদের দোকান থেকে বের করে দেওয়ার আলটিমেটাম দেয়। এরপর থেকে বিদেশি নাগরিক খুনের ঘটনা বেড়ে গেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত দুই মাসে কমপক্ষে ২৬ বাংলাদেশি খুন হয়েছেন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে লানেসিয়া থেকে তিন বাংলাদেশিকে অপহরণ করা হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার জোহানেসবার্গের এলরোডারো পার্ক এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীদের গুলিতে মুহাম্মদ উজ্জ্বল নামে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় আট মাস আগে দেশটিতে যান ওই যুবক। গত বুধবার মোসলবাই জর্জ ব্লঙ্কো এলাকায় প্রেমিকার ছুরিকাঘাতে তানজিল নামে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের শিকারের পর পুলিশের পক্ষে একটি ইউডি (অস্বাভাবিক মৃত্যু) মামলা ছাড়া ভুক্তভোগীর পক্ষে কোনো মামলা হয় না। তাই খুনের ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্তও হয় না। অপরদিকে অন্য কোনো দেশের নাগরিক সেখানে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে ওই দেশের কমিউনিটি নেতারা বাদী হয়ে মামলা করেন। সে দেশের দূতাবাসের উদ্যোগেও মামলা তদারকি করা হয়।
জোহানেসবার্গ থেকে চট্টগ্রামের বাসিন্দা আমিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে জীবন হারানোর শঙ্কা নিয়ে চলতে হয়। অন্য দেশের কেউ মারা গেলে সে দেশের লোকজন ও এম্বাসি (দূতাবাস) মামলা করে, কিন্তু বাংলাদেশিদের বেলায় কেউ আসে না।’ কেপটাউনের ব্যবসায়ী আবু মূসা বলেন, ‘বাসা থেকে দোকানে এলেই আতঙ্কে থাকতে হয়, এই বুঝি সন্ত্রাসীরা এসে গুলি শুরু করল।’ এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ সি আর আবরার বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশিদের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হলেও এ ব্যাপারে সরকারের মৌনতা উদ্বেগজনক।’
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমচুক্তি নেই। যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন তাদের প্রায় সবাই ভ্রমণ ভিসা বা চোরাইপথে গিয়ে সেখানে থেকে যাচ্ছেন। ফলে কেউ নিহত হলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকছে না। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রৌনক জাহান বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা যেহেতু আমাদের লেবার সেন্ডিং কান্ট্রি নয়, সুতরাং এর বেশি কিছু বলতে পারব না।’
এ বিষয়ে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘যারা বৈধভাবে শ্রমিক ভিসায় বিদেশ যান, তাদের যেকোনো সমস্যা দেখভালের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা এর আওতায় না পড়ায় আমরা বিষয়টি দেখতে পারি না।’
