বিএনপি না ঘরকা না ঘাটকা

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৩৩ পিএম

সদ্য-সমাপ্ত একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের  যে আট প্রার্থী পাস করেছেন তারা এখনো শপথ নেননি। মাঝখানে ঐক্য ফোরামের প্রধান নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন ডেকে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তাদের এমপিরা শপথ নেবেন। কিন্তু একদিন না যেতেই তার দলের সাধারণ সম্পাদক বললেন যে, তারা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, মিডিয়া কামাল হোসেনের কথা বুঝতে ভুল করেছে। গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক কথাটি বলেছেন ওইদিন মতিঝিলে কামাল হোসেনের চেম্বারে অনুষ্ঠিত ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকের পর। ফলে এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই যে শপথ বিষয়ে গণফোরামের পিছুহটার পেছনে ছিল মূলত বিএনপি ও অন্য জোটসঙ্গীদের চাপ।

উল্লেখ্য, ঐক্যফ্রন্টের আট জনের মধ্যে গণফোরামের সাংসদ আছেন দুজন, এদের একজন ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেছেন অন্যজন নির্বাচন করেছেন দলীয় প্রতীক ‘উদীয়মান সূর্য’ নিয়ে। আর নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই বিএনপি বলে আসছে যে তারা এ ফল মানেন না, তাই তাদের সাংসদরা শপথও নেবেন না। অন্যদিকে, কামাল হোসেন বিএনপি নেতাদের মতো নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে দাবি করলেও নির্বাচনে জয়লাভ করায় তাদের দুই প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অবশ্য, সাংসদদের শপথ নেওয়ার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বিধি অনুসারে, একজন সাংসদ সংসদেও প্রথম বৈঠক বসার ৯০ দিন পর্যন্ত শপথ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। অনেকের ধারণা, সময় শেষ হওয়ার আগে আগে শুধু গণফোরাম নয় বিএনপির সাংসদরাও শপথ নেবেন।

তারা এমন ধারণা করছেন মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, নির্বাচন নিয়ে যত অভিযোগই থাকুক, এবারের সংসদ নির্বাচনটি বিএনপিসহ সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য বলেও দেশি-বিদেশি প্রায় সব পর্যবেক্ষকের স্বীকৃতি পেয়েছে। এ কারণে সংসদটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকদের কাছে বড় কোনো প্রশ্ন নেই। এর ধারাবাহিকতায় এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সংসদীয় রাজনীতি অনুসরণকারী আর সব দেশের মতো আমাদের দেশেও সামনের দিনগুলোতে রাজনীতির মূল ফোকাসে থাকবে সংসদের কার্যক্রম।

এটা ঠিক যে আগের সংসদের শুরুর দিনগুলোতে বিএনপি ও তার প্রধান মিত্র জামায়াত রাজপথে বেশ উত্তাপ ছড়াতে পেরেছিল; এ কারণে একটা সময় পর্যন্ত রাজনীতির ফোকাসটা সংসদের বাইরেও চলে এসেছিল। কিন্তু এটাও ঠিক যে, ওই সময়ে বিএনপি-জামায়াত রাজপথে আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াওসহ যে-ধরনের নাশকতামূলক কর্মকা- করেছে তার ফলে দলগুলো একদিকে দ্রুত প্রতিবাদ-প্রতিরোধের শক্তি হারিয়েছে আরেকদিকে রাজনীতির মূলধারা থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়েছে। মূলত এ কারণেই ওই সংসদের ‘বৈধতা’ নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক ‘বিতর্ক’ থাকলেও তারা সরকারকে দ্রুত আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধ্য করতে পারেনি।

শুধু তা নয়, গত পাঁচ বছর বিএনপি নেতারা একেকটা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন আর বলেছেন, এ নির্বাচন কমিশন ও সরকারের অধীনে এটাই তাদের শেষ নির্বাচন। কিন্তু, সম্ভবত, এখনো তাদের সেই ‘শেষ নির্বাচনটি’ অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের আগে তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন, দুর্নীতির দায়ে দ-িত বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তাদের দেওয়া সাত দফার বাস্তবায়ন ছাড়া তারা ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেবেন না। কিন্তু তারা শুধু নির্বাচনটিতে অংশগ্রহণই করেননি, এখন তারা ‘রাতেই নির্বাচন শেষ’ বলে যতই অভিযোগ করুন, নির্বাচনের দিন সকালেও বলেছেন যেভাবে চলছে ভোটদান সেভাবে চললে নির্বাচনটা সুষ্ঠু হবে।  মোট কথা, যেভাবে বিএনপির নেতাকর্মীরা মামলা-মোকদ্দমার জালে জড়িয়ে একপ্রকার দিশেহারা বোধ করছেন তা থেকে বের হতে হলে তাদের সরকারের সঙ্গে একটা আপসরফায় পৌঁছতে হবে। আর এটা সংসদ বর্জন করে কিছুতেই সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, দলটি সৃষ্টির পর গণফোরাম প্রথমবারের মতো দুজন সাংসদ পেয়েছে। সাংসদ দুজনও অনেক কষ্ট করে বিজয় অর্জন করেছেন। এ কারণে দলের গত ৫ জানুয়ারির বর্ধিত সভায়, গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুসারে, প্রায় সব বক্তা সংসদে দলের প্রতিনিধি পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। উপরন্তু, অন্তত সুলতান মনসুর সম্পর্কে বলা যায়, আওয়ামী লীগ তাকে মনোনয়ন দেয়নি বলেই তিনি গণফোরামে ভিড়েছেন; অন্যকথায় দলত্যাগের পেছনে তার অভীষ্ট ছিল যেকোনো মূল্যে সাংসদ হওয়া। এ সুযোগ যখন তার হাতে ধরা দিয়েছে তখন তিনি তা হেলায় হারাতে চাইবেন না।

আর গণফোরাম যদি সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি কি তাকে ত্যাগ করতে পারবে? মনে রাখতে হবে, বিএনপি অনেক সাধ্যি-সাধনার পর কামাল হোসেনকে তাদের সঙ্গে পেয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলাটা তার জন্য জরুরি ছিল। কারণ একদিকে জামায়াতসহ ২০ দল নামক যে-জোটটি গত আট-নয় বছর ধরে চর্চা করে আসছে, বিশেষ করে ২০১৫ সালের সহিংস ও ব্যর্থ আন্দোলনের পর, তা একেবারেই ভোঁতা হয়ে গেছে। এমনকি, তা অনেকাংশে বিএনপির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, দেশে বিশালসংখ্যক যে উদারগণতান্ত্রিক ভোটার আছে তাদের কাছে তার ভাবমূর্তি বরাবরই নেতিবাচক। ধারণা করা হচ্ছিল, কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যে-উদারপন্থি কিছু দল গত কয়েক বছর ধরে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছিল তাদের সঙ্গে পেলে ওই পরিস্থিতির আংশিক হলেও উন্নতি ঘটতে পারে। যদিও প্রথমে সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরীর সঙ্গে কামাল হোসেনের বিচ্ছেদ এবং পরে নির্বাচনে জামায়াতকে ২২টা আসনে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার কারণে বিএনপি’র ওই লাভের সম্ভাবনাটা অনেকটাই মার খেয়েছে, তারপরও বর্তমানে দলটি যে-সংকটকাল কাটাচ্ছে তাতে কামাল হোসেনের সঙ্গ তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত আন্তর্জাতিক পরিসরে দলটির ওজর-আব্দার পৌঁছাতে হলেও বিএনপির কামাল হোসেনকে দরকার। দেশের সুশীল সমাজের সদস্য বলে পরিচিত অনেক ব্যক্তি, এমনকি ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতো অতিবিএনপি-ঘেঁষা বুদ্ধিজীবীরা যে বিএনপিকে সংসদে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তার কারণও এখানেই নিহিত। তারা জানেন, বিএনপি যদি আবারও ২০১৪-১৫ সালের নেতিবাচক রাজনীতিতে ফিরে যায় তাহলে দলটির অস্তিত্বই সংকটে পড়বে। তাদের কেউ কেউ এমনও উদাহরণ টানছেন যে ১৯৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগও এমন সংকট মোকাবিলা করেছে। ১৯৭৫ সালে তাদের শীর্ষ নেতৃত্বেও চরম নৃশংস হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হারানোর পর পুনরায় তা ফিরে পেতে তাকে দীর্ঘ ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

তবে এখানে বলতেই হবে যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একই প্রকৃতির দল নয়। দল দুটির গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে বিরাট পার্থক্য। আওয়ামী লীগ গড়ে উঠেছে মাঠ থেকে, দীর্ঘ গণ-আন্দোলনের পরিণতিতে সংঘটিত একটা বিশাল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানের বিপুল অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এ দলটি। অন্যদিকে বিএনপি গড়ে উঠেছে সেনাশাসনের ছত্রছায়ায় ক্ষমতার হালুয়া-রুটি বিলানোর মাধ্যমে। এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে তিন জোটের এক জোটের বড় শরিক হিসেবে অংশগ্রহণ ব্যতীত আর কোনো শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এ দলের নেই। তাছাড়া নেতাকর্মীদের ধৈর্য-সাহস-সহশীলতা-শৌর্যের দিক থেকেও বিএনপি তার প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। তাই দলটির পক্ষে বর্তমান পরিস্থিতিতে সুচিন্তিত একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো একটা কঠিন কাজই বটে।

কাজটা কঠিন তা এ কারণেও বলা হচ্ছে যে ২০১৩-১৫ সালে দলটি সারা দেশে যেসব নাশকতামূলক কা- করেছিল তার পরিণতিই যে আজকের পরিস্থিতি সে-সম্পর্কে তার নেতাদের স্পষ্ট কোনো উপলব্ধি আছে বলে মনে হচ্ছে না। সেদিন যদি তারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্যে থাকতেন তাহলে আজ যে কথায় কথায় তাদের বিরুদ্ধে সরকার নাশকতার মামলা দিচ্ছে তা সম্ভব হতো না। তাছাড়া দলটি এক ধরনের নেতৃত্বহীন বললেও ভুল বলা হয় না। বিএনপি’র চেযারপারসন, আগেই বলা হয়েছে, দুর্নীতি দায়ে জেলে আছেন, আর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তিনটি মামলায় যাবজ্জীবনসহ নানা মেয়াদের সাজা মাথায় নিয়ে লন্ডনে আছেন নির্বাসনে। মহাসচিব ফখরুল নির্বাচনের সময়  দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি যদি ঐক্যফ্রন্টকে অক্ষুণœ রাখার স্বার্থে সংসদে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দেন তা অন্য নেতারা কতটুকু মানবেন  সে-ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ আছে। ফখরুলের জন্য এখানে যেটা বেশ স্পর্শকাতর তা হলো নির্বাচনে তিনি পাস করেছেন কিন্তু তার সহযোগী সব শীর্ষস্থানীয় নেতা ফেল করেছেন। ফলে তারা চাইতেই পারেন যে দল তাদের ভাষায় একটা ‘অবৈধ’ সংসদকে বৈধতা না দিক।

সবমিলিয়ে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলটি, ১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়ার পর থেকে যে-দলটি বহু বছর সরকার পরিচালনা করেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচন-উত্তর পরিস্থিতিতে যে এক ধরনের উভয় সংকটে পড়েছে তা স্পষ্ট।

                                                                                                                                                                                                        লেখক
                                                                                                                                                                                              সাংবাদিক ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত