শ্রমিকদের টানা আন্দোলন ও সরকারের চাপের মুখে গতকাল শনিবার ছুটির দিনে বৈঠক করে পোশাক খাতের শ্রমিকদের মূল মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন মালিকরা। দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠক করে মূল মজুরি কমে যাওয়া গ্রেডগুলোর মজুরি আরও বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নেন তারা। এতে বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট)-সহ ২০১৩ সালের মজুরি কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকদের পাওয়া এখনকার মূল মজুরির চেয়ে নতুন গ্রেডের মূল মজুরি কম হবে না। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মূল বেতন বাড়ানো হলেও নতুন মজুরি কাঠামোতে বাড়িভাড়া ভাতাসহ অন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছিল, তার কোনোকিছুই কমানো হবে না। ফলে ওইসব গ্রেডের শ্রমিকদের মূল মজুরির সঙ্গে আনুপাতিক হারে অন্যান্য সুবিধাও বাড়বে। আজ রবিবার বিকেল ৩টায় শ্রম মন্ত্রণালয়ে বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেওয়া হবে।
গতকাল শনিবার ছুটির দিনে সচিবালয়ে পোশাক খাতের মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকে বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্ববতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেওয়া দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইএর সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এবং তৈরি পোশাক মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। শনিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা ওই বৈঠক শেষে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈঠকে সমস্যার সমাধানবিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন মজুরি কাঠামোতে যেসব গ্রেডের মূল মজুরি বিদ্যমান মূল মজুরির চেয়ে কমে গেছে, সেসব গ্রেডের মূল মজুরি বাড়ানো হবে।আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কখন দেওয়া হবে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, রবিবার (আজ) ৩টায় শ্রমিক ও সরকার পক্ষের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা আছে। ওই বৈঠক শেষে ঘোষণা দেওয়া হবে।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, মূল মজুরি বাড়ানো হলেও নতুন মজুরি কাঠামোতে বাড়িভাড়াসহ অন্য যেসব সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, তার কোনো কিছুই কমানো হবে না। কোনো শ্রমিকের মজুরি বা অন্য কোনো সুবিধাই কমবে না।
শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজকের (শনিবার) বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, যেসব গ্রেডে মূল মজুরি যে পরিমাণ কমেছে, মালিকরা সে পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে। এতে শ্রমিকের অন্য কোনো সুবিধা কমবে না।’
২০১৩ সালের মজুরি কাঠামোর মূল বেতনের সঙ্গে ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হয়ে শ্রমিকরা এখন যা পান, নতুন ঘোষিত কাঠামোতে কয়েকটি গ্রেডে মূল মজুরি তার চেয়ে কমে গেছে। এতে শ্রমিকদের ওভারটাইম ভাতা, গ্র্যাচুইটি, উৎসবভাতা কমে যাওয়ার শঙ্কা নিয়ে রবিবার থেকে আন্দোলনে নামে শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৯ জানুয়ারি মালিক-শ্রমিক পক্ষ নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান। ওইদিনই মজুরি সমস্যা সমাধানে ১২ সদস্যের কমিটি করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার কমিটির প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়। যেসব গ্রেডে মূল বেতন কমে গেছে, ওইসব গ্রেডের মূল বেতন বাড়ানোর পক্ষে থাকলেও এজন্য বাড়তি অর্থ খরচ করতে নারাজ থাকেন তারা। মালিকপক্ষের প্রস্তাব ছিল, নতুন মজুরি কাঠামোতে থাকা ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতাকে ২০১৩ সালের কাঠামোর মতো ৪০ শতাংশে নামিয়ে এনে সাশ্রয়ী অর্থ শ্রমিকদের মূল মজুরিতে অন্তর্ভুক্ত করা।
শনিবারের বৈঠকে উপস্থিত শ্রম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মালিকপক্ষের ওই প্রস্তাব সরকার মেনে নেয়নি। কারণ, বাড়িভাড়া ভাতা কমিয়ে এখন মূল বেতন বাড়ানো হলে যেসব গ্রেডের মূল বেতন কমেনি, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাতে শ্রমিকদের একপক্ষ লাভবান হলেও অন্যপক্ষ ঘোষিত মজুরি কাঠামোর চেয়ে কম পাবেন। তখন আবার বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরে পোশাক মালিকরা অন্য কোনো সুবিধা কাটছাঁট না করেই মূল বেতন বাড়ানোর সরকারের প্রস্তাব মেনে নেন।
নতুন মজুরি কাঠামো গত ডিসেম্বর মাস থেকে কার্যকর হয়েছে। সে হিসেবে, এ মাসে শ্রমিকরা ঘোষিত কাঠামো অনুযায়ীই মজুরি পাবেন। এখন যেসব গ্রেডে মূল বেতন বাড়ানো হবে, সে সব গ্রেডের শ্রমিকরা জানুয়ারি মাসের বর্ধিত মজুরি ফেব্রুয়ারি মাসের মজুরির সঙ্গে পাবেন বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।
