উন্নয়নের পক্ষে ভোট চেয়ে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সংশোধন করতে গিয়ে এবার বড় বড় প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে মূল বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, কাজের ধীরগতিসহ নানা সংকটের কারণে তা খরচ করতে না পারায় বাড়তি বরাদ্দ ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। তবে যেসব প্রকল্পে বাস্তবায়নের গতি বেশি, তেমন কয়েকটি বড় প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানোও হচ্ছে।
প্রতিবছর ডিসেম্বরের মধ্যেই এডিপি সংশোধনের কাজ শুরু করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। এবারও একই সময়ে উদ্যোগ নিয়েছিল তারা। তখন নির্বাচনের আগে এডিপি সংশোধনের কাজ স্থগিত করার পরামর্শ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। তার প্রেক্ষিতেই নির্বাচনের পর তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর (ফাস্টট্র্যাক) মধ্যে চলতি ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের এডিপি সংশোধনে পদ্মা সেতু প্রকল্প, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্প, দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুনধুম, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। এ ছাড়া, দক্ষিণ এশীয় উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাসেক) প্রকল্প ২-এর বরাদ্দও কমানো হচ্ছে। সারা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ সড়ক ও সেতু বিভাগ ও বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কমছে। বরাদ্দ বাড়ার তালিকায় থাকা বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেলের পৃষ্ঠা ২ কলাম ৪ >
সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প, ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট (বাংলাদেশ) প্রকল্প, জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প। একই সঙ্গে বাড়ছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বরাদ্দ।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলতি অর্থবছর বড় প্রকল্পে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে কয়েকটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতি কিছুটা কমে যায়। নির্বাচন অবশ্যই একটা বড় ইস্যু। এই সময়ে প্রকল্পের গতি কমে যাওয়াকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না।
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা ঢিলেমি ভাবও ছিল। আবার অনেক প্রকল্পে ভালো অগ্রগতি হয়েছে। আমরা গতি বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছি।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কারণ যা-ই হোক না কেন, নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। নইলে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়তে থাকে। এ জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রকল্পের কাজ শেষ করার বিষয়ে জোর দেওয়ার বিকল্প নেই।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দের অর্থ খরচ না হওয়ায় সংশোধনীকালে তা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে কমানো হচ্ছে দুই হাজার ৪১ কোটি টাকা। মূল বাজেটে এ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল পাঁচ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। সংশোধন করে তা তিন হাজার ২৯১ কোটি টাকায় নামানো হচ্ছে।
পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, নকশা জটিলতার কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্পে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়নি। এ জন্য এক বছর মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। এখন বছরভিত্তিক বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। বাড়তি এক বছর সময় যেহেতু পাওয়া গেছে, এ জন্য বরাদ্দও কমানো হচ্ছে। আর চলতি অর্থবছর বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হবে না।
দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুনধুম প্রকল্পে চলতি অর্থবছর বরাদ্দ ছিল এক হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক সহায়তা ৯৭৫ কোটি টাকা, সরকারের নিজস্ব তহবিল ছিল ৫০০ কোটি টাকা। সংশোধনীতে বরাদ্দ কমিয়ে করা হচ্ছে ৫২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক অর্থায়ন ৫০০ কোটি ও সরকারের ২৯ কোটি টাকা। নভেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ২৮১ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জমি অধিগ্রহণে জটিলতার কারণে এ প্রকল্পের কাক্সিক্ষত অগ্রগতি সম্ভব হচ্ছে না।
সরকারের তহবিল থেকে প্রায় ৩৫৬ কোটিসহ বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে চলতি অর্থবছর বরাদ্দ ছিল প্রায় ৬৫৪ কোটি টাকা। বরাদ্দের বাকি অর্থ বৈদেশিক সহায়তা। ছয় মাসের মাথায় এ প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে ৩৩২ কোটিতে নামানো হচ্ছে।
এক হাজার ৮৫০ কোটি টাকা সরকারের তহবিলসহ এবারের মূল বাজেটে সাসেক প্রকল্প ২-তে বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। বাকিটা বৈদেশিক সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এখন অর্থ ছেঁটে এ প্রকল্পে রাখা হচ্ছে এক হাজার ৫০ কোটি টাকা। নভেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৫৬ কোটি টাকা।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে এবার বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ২২৬ কোটি টাকা। সংশোধনীকালে তা কমিয়ে ৩০৬ কোটিতে নামানো হচ্ছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২৭৬ কোটি টাকা।
এর বাইরে খাত হিসাবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ ৯ হাজার ৯২ কোটি থেকে কমিয়ে ছয় হাজার ৩৬৬ কোটিতে নামানো হচ্ছে। বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করতে না পারায় তারা বাড়তি অর্থ সমর্পণ করেছে।
কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহু লেন সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্পে চলতি বছরে বরাদ্দ ছিল এক হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। সংশোধনীতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে দুই হাজার ১৯০ কোটি টাকায়। আগামী ফেব্রুয়ারি থেকেই মূল টানেল নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার প্রেক্ষিতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৭৫৮ কোটি টাকা।
ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট (বাংলাদেশ) প্রকল্পে চলতি বছরের বরাদ্দ ছিল ৭০৫ কোটি টাকা। ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়িয়ে তা ৮০৫ কোটিতে উন্নীত হচ্ছে। নভেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পে ৪৬৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
ঢাকা শহরে সাবওয়ে (আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো) নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সমীক্ষা প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৮১ কোটি টাকা। এডিপির সংশোধনীতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১০৩ কোটি টাকা। গত মাস পর্যন্ত এতে ব্যয় হয়েছে ৬৬ কোটি টাকা।
গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পে চলতি অর্থবছর বরাদ্দ রয়েছে ৩৩৪ কোটি টাকা। সংশোধনীতে বরাদ্দ বাড়িয়ে দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা করা হচ্ছে।
চলতি অর্থবছর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। এতে সরকারের ১২ হাজার ৬৯৮ কোটি ও বৈদেশিক সহায়তা ছিল ৭ হাজার ৪৬৬ কোটি। এডিপি সংশোধনীতে এ বিভাগে বরাদ্দ বেড়ে ২৫ হাজার ৭৬৬ কোটি হচ্ছে। এর মধ্যে বৈদেশিক সহায়তা থাকছে ছয় হাজার ৯৯১ কোটি ও সরকারের তহবিল ১৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা।
সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেডে এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্পে চলতি বছরের বরাদ্দ ছিল ৪৮৫ কোটি টাকা। এডিপির সংশোধনীতে বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে বরাদ্দ দাঁড়াবে এক হাজার ১০১ কোটি টাকা।
