অনুদান পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা আদায়!

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০৩:০৬ এএম

‘ফ্রান্স থেকে ৫৪ হাজার কোটি টাকা আনা হয়েছে মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য। এই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে আটকা আছে। প্রধানমন্ত্রী (বিশেষ কমিশন নিয়ে) এই টাকা ছাড় করে দেওয়ার জন্য বলেছেন। আপনাদের মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় এর থেকে ১ শতাংশ পেলেও ২০০ কোটি টাকার বেশি পাবেন। এই টাকা ছাড় করাতে কিছু খরচ আছে। খরচ দিলে আপনাদের ২০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা অনুদান পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিব।’

এভাবে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসায় গিয়ে অনুদান পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে একটি প্রতারকচক্র টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় চক্রটির ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

সিআইডি কার্যালয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার (সিরিয়াস অ্যান্ড হোমিসাইডাল স্কোয়াড) সৈয়দা জান্নাত আরা গতকাল মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘প্রতারকচক্র সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্যাড নকল করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর জাল করেছে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও এনএসআই-প্রধানের স্বাক্ষর জাল করে প্রত্যয়নপত্র তৈরি করে। তারা ৫৪ হাজার কোটি টাকা থেকে বিশাল একটি অংশ প্রধানমন্ত্রীকে কমিশন হিসেবে দেওয়া হবে বলে অপপ্রচার চালায়। তাদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে মানহানিকর ও ষড়যন্ত্রমূলক ভিডিও ও অডিও রেকর্ড জব্দ করা হয়েছে।’

সিআইডির দাবি, এই চক্রের অন্যতম হোতা লক্ষ্মীপুর সদরের আবদুল্লাহপুর গ্রামের তরিকুল্লাহর ছেলে হেলাল উদ্দিন (৫৫)। তার বর্তমান বাসা দক্ষিণখান থানার আশকোনা এলাকায়। এই চক্রে আরও রয়েছেন নাটোরের লালপুর থানার কেশবপুর গ্রামের এনামুল হক (৪৮) ও টাঙ্গাইল সদর থানার বেপারীপাড়ার নাজমুল হাবিব। যাচাই-বাচাইয়ের জন্য চক্রের অপর সদস্যদের নাম প্রকাশ করেনি সিআইডি।

অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) নিউটন কুমার দত্ত জানান, আসামিদের কাছ থেকে বাগেরহাটের রামপাল থানার কালিবাড়ী এলাকার প্রয়াত লতিফ হাওলাদারের ছেলে ফরিদুজ্জামান সেলিমের নামে ফ্রান্সের এলসিএল ব্যাংক থেকে মানিভোকাল কার্ডের মাধ্যমে ৫৪ হাজার কোটি টাকা আনার প্রত্যয়নপত্র পাওয়া গেছে, যা ২০১২ সালের ৮ মে তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

ওই প্রত্যয়নপত্রে সরকারের পরামর্শক্রমে ৫৪ হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ উন্নয়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা, মেডিকেল কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা স্থাপনসহ সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হবে বলে বলা হয়। এটি পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে।

নিউটন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে জানান, ফরিদুজ্জামান সেলিম আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের পাকপাঞ্জাতন দরবার শরিফে যাতায়াত করেন। সেখানে থেকে তিনি প্রতারণার জাল তৈরি করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে এ ধরনের কোনো টাকা আনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের এসব প্রত্যয়নপত্র ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। শহীদুজ্জামান সেলিম নিজেও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এই চক্রের শেকড় অনেক গভীরে। গ্রেপ্তার আসামিরা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা। হেলাল উদ্দিন নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। একসময় মোংলা বন্দরে চাকরি করতেন এবং দুর্নীতির কারণে দুদকের মামলায় জেল হওয়ার পর চাকরি চলে যায়। তিনি সব সময় বিলাসবহুলভাবে চলাফেরা করতেন। তার দুই স্ত্রীর পেছনে মাসে ৪-৫ লাখ টাকা খরচ করতেন। সব সময় ট্রাস্টের ট্যাক্সি ক্যাব ও প্রাডো গাড়ি ভাড়া করে চলতেন। অপর আসামি নাজমুল আলিকো লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কনসালট্যান্ট হিসেবে উচ্চ বেতনে চাকরি করতেন। আর নাজমুলও পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে লেখাপড়ে করেছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত