অভিজিৎ ও জুলহাজ-তনয় হত্যা মামলা

‘মেজর জিয়ার নির্দেশে’ একই গ্রুপ ঘটায় দুই হত্যাকাণ্ড

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০২:০৬ এএম

ব্লগার ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ড. অভিজিৎ রায় এবং সমকামীদের অধিকারবিষয়ক সাময়িকী ‘রূপবান’-এর প্রকাশক-সম্পাদক জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব তনয় হত্যা মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে আদালতে দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। তারা বলছে, চাঞ্চল্যকর এই দুটি হত্যাকাণ্ড ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের’ (এবিটি), পরবর্তী নাম ‘আনসার আল ইসলাম’, একই গ্রুপ ঘটিয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পলাতক ও সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া মেজর জিয়ার নির্দেশেই জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডে এবিটির ১৩ সদস্য ও অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে ১১ জন অংশ নেয়।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২৫ এপ্রিল রূপবান ম্যাগাজিনের সম্পাদক জুলহাজ মান্নান-মাহবুব তনয় হত্যাকাণ্ডের তৃতীয় ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ড. অভিজিৎ হত্যা মামলার চতুর্থ বার্ষিকী। আমরা বার্ষিকীর আগেই (ফেব্রুয়ারি মাসে) এই দুই মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করব। দুটি হত্যাকাণ্ড প্রায় একই গ্রুপ ঘটিয়েছে বলে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।’ ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে একুশের বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় অভিজিৎকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা; মারাত্মক আহত হন তার স্ত্রী ডা. রাফিদা আহমেদ বন্যাও। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিজিৎ মারা যান। এ ঘটনায় ২৭ ফেব্রুয়ারি তার বাবা শিক্ষাবিদ অজয় রায় শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়া অভিজিৎ খুনের ঘটনায় দেশটির তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছিল।

এদিকে গতকাল এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের ধার্য দিনে তদন্ত কর্মকর্তা সময় চেয়ে আবেদন করেন। পরে আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন দিন ঠিক করেন ঢাকা মহানগর হাকিম সরাফুজ্জামান আনসারী।

২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় কলাবাগানের লেক সার্কাস রোডের বাসায় ঢুকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির কর্মকর্তা জুলহাজ ও তার বন্ধু তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। খুনিরা পালানোর সময় বাধা দিতে গেলে বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী পারভেজ মোল্লাকেও তারা কুপিয়ে জখম করে। পরে রাস্তায় একজনের কাছ থেকে একটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেন এএসআই মমতাজউদ্দীন। ব্যাগটিতে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। একই রাতে অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে কলাবাগান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন জুলহাজের ভাই মিনহাজ মান্নান।

গতকাল দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল জানান, গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর অদূরে টঙ্গী থেকে জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত এবিটির সামরিক শাখার সদস্য আসাদুল্লাহ ওরফে ফখরুল ওরফে ফয়সাল ওরফে জাকিরকে (২৫) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ঝিনাইদহের মহেশপুর থানার মদনপুর বটতলা গ্রামের জামায়াত নেতা এমদাদুল হকের ছেলে। এই হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে এবিটির ১৩ জন সম্পৃক্ত ছিল। তাদের মধ্যে সাতজন হত্যাকাণ্ডের দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল।

তিনি বলেন, ‘জুলহাজ মান্নানকে হত্যার জন্য অনেক দিন ধরেই পরিকল্পনা করা হয়। প্রথমে তার সম্পর্কে সব তথ্য সংগ্রহ করে আসামিরা, এলাকা রেকি করে তারপর নামে কিলিং মিশন। ঘটনার দিন এবিটির গোয়েন্দা দলের দুজন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, ভেতরে ঢোকে পাঁচজন। কুরিয়ার সার্ভিসের ভুয়া আইডি ও পার্সেল নিয়ে প্রবেশ করা পাঁচজনের দুজন দারোয়ানকে আটকে রাখার কাজ করে এবং অপর তিনজন জুলহাজ ও তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করে। দারোয়ানকে আটকে রাখা দুজনের একজন হলেন আসাদুল্লাহ। জুলহাজের বাড়ির বাইরে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে দৌড়ে পালাতে দেখা যায়। ঘটনার দিন টঙ্গী থেকে বাসে করে হত্যাকারীরা ঢাকায় আসে। ’

মনিরুল বলেন, ‘এই মামলায় গ্রেপ্তার অন্য তিনজন হলো আরাফাত ওরফে শামস ওরফে সিয়াম ওরফে সাজ্জাদ, সায়মন ওরফে শাহরিয়ার এবং আবদুল্লাহ ওরফে জুবায়ের ওরফে জায়েদ ওরফে জাবেদ ওরফে আবু ওমায়ের। এই তিনজনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ ছাড়া আসাদুল্লাহ ২০১৬ সালে উত্তর বাড্ডার সাতারকুলে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানোর সময় পুলিশ পরিদর্শক বাহাউদ্দিন ফারুকীকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে এবং তার সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। তাকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আশা করছি, পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্রটি উদ্ধার করা সম্ভব হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, আসাদুল্লাহর বাবা চুয়াডাঙ্গার মাধবপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। তিনি সে সময় জামায়াতে ইসলামির রুকন ছিলেন। ২০০১ সালে মদনপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে পাস করেন আসাদুল্লাহ। এরপর যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা পড়েন তিনি। পরে মোবাইল মেকানিকের কাজ করেন। ২০১৫ সালে তার বন্ধু শহীদুজ্জামান এবিটিতে যোগ দেয়। তার হাত ধরে অপর এবিটি নেতা মুকুল রানা ওরফে শরিফুল ইসলাম শরিফ তাকে এবিটিতে দীক্ষা দেন। একই বছরের শেষের দিকে সংগঠনে তার নাম দেওয়া হয় ফয়সাল। এরপর বিভিন্ন সময় তিনি নাম পরিবর্তন করেন। ২০১৬ সালে আসাদুল্লাহ দাওরা ট্রেনিং সম্পন্ন করেন। তিনি বাড্ডা, আশকোনা, গাজীপুরের বিভিন্ন আস্তানা বা মারকাজে বাসা ভাড়া নেওয়ার পদ্ধতি, নিরাপত্তার বিষয়, ডে-অ্যামবুশ, সম্মানজনক মৃত্যু, ছুরি ও চাপাতি চালানো, টার্গেট ব্যক্তিকে হত্যা করার এলাকায় রেকি করা এবং হত্যার সময় ও স্থান নির্ধারণ করার পদ্ধতি সম্পর্কে সামরিক ট্রেনিং নেন। ’

গতকাল বিকেলে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হলে আদালত আসাদুল্লাহর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে বলেও জানান সিটিটিসি প্রধান।

পুলিশ কর্মর্কতা মনিরুল দেশ রূপান্তরকে জানান, অভিজিৎ হত্যা মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রথমে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে থাকা মামলাটির তদন্তভার গত বছরের শুরুতে সিটিটিসির কাছে হন্তান্তর করা হয়। সিটিটিসি তদন্তভার নেওয়ার আগে এ মামলায় সাত সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার হয়। পরে মোজাম্মেল হোসেন ওরফে সাইমন, আবু সিদ্দিক সোহেল ও আরাফাত ওরফে শামস ওরফে সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। এ তিনজনকে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে।

তিনি আরও জানান, গত মঙ্গলবার রাতে টঙ্গীতে গ্রেপ্তার আসাদুল্লাহ এবং অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনসহ শনাক্তকৃত ব্যক্তিদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে দুজন জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডেও সরাসরি অংশ নেয়; অন্যরা ছিল সহযোগী সদস্য। এ ছাড়া বরখাস্ত হওয়া মেজর জিয়াকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ২০১৬ সালের ২ আগস্ট ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল পুলিশ।

তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সিটিটিসির হাতে গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে দুজন ‘গোয়েন্দা শাখা’র আর অন্য দুজন ‘সামরিক শাখা’র সদস্য হিসেবে সরাসরি অভিজিৎ ও জুলহাজ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। এ ছাড়া দুটি হত্যাকাণ্ডেই সরাসরি অংশ নেওয়া আরও চারজনকে শনাক্ত করা গেছে। এদের মধ্যে একজন দেশে থাকলেও অন্যরা বিদেশে পালিয়ে গেছে; কেউ কেউ এখন আর বেঁচে নেই বলেও ধারণা করা হচ্ছে। আর এই দুই হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত অন্যতম সন্দেহভাজন মুকুল রানা ডিবি পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে।

দুই হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তদন্ত সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের প্রকৃত নাম জানা মুশকিল। তবে পলাতকদের বেশ কিছু ছদ্মনাম যা পাওয়া গেছে তাতে শামীম, সিয়াম, তাহরিক, মারুফ, জামান, আকাশ, রাফি, আলম, তৈয়ব, জনি, রায়হান ইত্যাদি নাম জানা গেছে। এর মধ্যে একজনেরই কয়েকটি করে নাম রয়েছে, যা তাদের ভাষায় সাংগঠনিক নাম। ’

এদিকে অভিজিতের বাবা ও মামলার বাদী অধ্যাপক অজয় রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এই চার্জশিটের জন্য প্রায় চার বছর ধরে অপেক্ষা করছি। চার্জশিট না হলে বিচারকাজ শুরু হবে না। আমি বাবা হিসেবে বিচার চাইতেই পারি। আমি জানতে চাই, আমার ছেলের হত্যাকারী কারা, তারা কেন আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, এরা এখন কোথায় আছে? আগামী ফেব্রুয়ারিতে যদি তারা চার্জশিট দিতে পারে নিশ্চয়ই এটা ভালো খবর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত