প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন ৭ জানুয়ারি। পরের দিনই তিনি চলে আসেন আগামী পাঁচ বছর তার প্রধান কর্মক্ষেত্র জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে। আর গতকাল যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ৫৩টি ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের। মূল উদ্দেশ্য ছিল সবার কথা শোনা। সেটা তিনি শুনেছেন প্রায় ৩ ঘণ্টার মতবিনিময় সভায়। সারাক্ষণ মাথা গুঁজে সবার কথা টুকেও নিয়েছেন। এরপর সবার শেষে নিজের বক্তব্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ফেডারেশনগুলোর সমস্যাগুলো তিনি দেখবেন আন্তরিকভাবেই। তবে ক্রীড়া ফেডারেশন পরিচালনায় কারও অবহেলা থাকলে সেটা বরদাস্ত করবেন না কোনো অবস্থাতেই।
গতকাল বেশিরভাগ ক্রীড়া ফেডারেশনের কর্তারা নিজেদের চাওয়া-পাওয়াগুলো মন্ত্রীকে অবহিত করেছেন। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ বলেই এই মন্ত্রীর কাছে চাওয়াটাও অনেক বিস্তৃত ফেডারেশন কর্তাদের। এই যেমন বাংলাদেশ অ্যামেচার রেসলিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তাবিবুর রহমান পালোয়ান মন্ত্রীকে কাছে পেয়েই দাবি জানালেন এভাবে, ‘আগে বলা হয়েছিল এই এনএসসি টাওয়ারেই সব ফেডারেশনগুলোর জায়গা হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা এখানে কোনো জায়গা পাইনি। আমরা আসা করি আপনি আমাদের এই টাওয়ারেই জায়গা দেবেন।’
দাবা ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহাবউদ্দিন শামীম স্থায়ী ভেন্যুর দাবি জানিয়ে বলেন, ‘দাবা একটি জনপ্রিয় খেলা। অথচ ৩০০ জন নিয়ে একটি বড় টুর্নামেন্ট করার জায়গা আমাদের নেই। আমরা আশা করব নতুন মন্ত্রী জায়গা সংকট দূর করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।’ বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন বাহারের চাওয়া একটি অন্যরকম। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর এনএসসি’র এজিএম হয়েছে মাত্র ২ বার। আমাদের কথা বলার জায়গা হচ্ছে এজিএম। সেখানেই আমরা আমাদের সমস্যার কথা বলব। নিয়মিত এজিএম আয়োজনের দাবি জানাচ্ছি।’ ভলিবল ফেডারেশনের সভাপতি আতিকুল ইসলাম মন্ত্রীর উদ্দেশ্যে ক্রীড়াবিদদের সারা বছর অনুশীলনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এখনকার যুব সমাজ ইন্টারনেটে ঢুকে গেছে। ক্রীড়াঙ্গন ইতিবাচক হলে, সেই পরিবেশ থাকলে আমরা এটা বদলে দিতে পারব। এজন্য অনুশীলনের ওপর জোর দিতে হবে। তবে নব্বই দিন অনুশীলন করে পদকের চিন্তা বাদ দিতে হবে।’
ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বাজেট দাবি করে বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সভাপতি নুরুল ফজল বুলবুল বলেন, ‘৯০০ কোটি টাকার মধ্যে ৮০০ কোটি টাকাই যদি স্থাপনায় চলে যায় তাহলে আর ক্রীড়াঙ্গনের কী থাকল? আমি সবার পক্ষ হয়ে বলছি, ক্রীড়াঙ্গনে ৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট চাই। ৫ লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকার ক্রীড়াঙ্গনের বাজেট এমন কোনো বড় কিছু নয়।’
সরকারি দল আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হারুনুর রশীদ নতুন প্রতিমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘দুই যুগ পরে প্রথম কোনো মন্ত্রী ফেডারেশনগুলোকে নিয়ে বসেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সারা পৃথিবীতে হয়তো এমন কোনো নজির নেই যে, এত কম অর্থ দিয়ে ক্রীড়াঙ্গন চলে। এ দিয়ে যে দুই একটা পদক আসে এ জন্য ক্রীড়া সংগঠকদের আগে পদক দেওয়া উচিত।’
সবার কথা শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের সবার কথাই শুনেছি। আমরা আরেকটি সভা করব আপনাদের সঙ্গে। কারণ আমরা যে ইশতেহার দিয়েছি সেটাও বাস্তবায়ন করতে হবে। আপনারা লিখিতভাবে আপনাদের চাওয়া-পাওয়া জানান। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দিন। আমরা অবশ্যই এগুলো নিয়ে কাজ করব।’ মন্ত্রী এডহক কমিটি দিয়ে চলা ফেডারেশনগুলোতে দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন, ‘আমার খারাপ লেগেছে যে ৫৩টি ফেডারেশন-অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে ২১টির অ্যাডহক কমিটি দিয়ে চলছে। এসব ফেডারেশনে নির্বাচিত কমিটি না হলে ক্রীড়াঙ্গন এগোবে না।’ তিনি একই সঙ্গে পদ ধরে রেখে সমাজে পরিচিতি পাওয়া সুবিধাবাদী মানুষগুলোকে ক্রীড়াঙ্গন ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন, ‘ক্রীড়াঙ্গনটা এমন জায়গা যার জন্য ভালোবাসা থাকতে হবে। যাদের ভালোবাসা নেই তাদের ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত না থাকাই উচিত।’
একই সঙ্গে নতুন মন্ত্রী ফেডারেশন কর্তাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই অনেক কিছু জানি। কে কেমন সব আমার জানা। আমাকে দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রী আছেন। আর আপনাদের কাজ দেখার জন্য আমি আছি। সুতরাং আপনারা কাজ করুন, আপনাদের কাজের ওপরই নির্ভর করবে ফেডারেশনগুলোতে ভবিষ্যতে কে থাকবে, কে থাকবে না।’ সব মিলিয়ে শুরুটা মন্দ হয়নি নতুন প্রতিমন্ত্রীর। এখন কথার সঙ্গে তার কাজের মিল থাকলেই হয়।
