চট্টগ্রামে অনেকটা প্রকাশ্যেই এখন কার্যক্রম চালাচ্ছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর। মূলত স্কুল-কলেজে পড়–য়া কিশোররাই তাদের টার্গেট। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সুকৌশলে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং এনজিওর সঙ্গেও নিজেদের যুক্ত করেছে তারা। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টার লাগানো ছাড়াও চলছে লিফলেট বিলি। সম্প্রতি নগরীতে গ্রেপ্তার হিযবুত সংগঠক সাবকাত আহম্মেদ (২০) জিজ্ঞাসাবাদে সংগঠনের কৌশল ও কার্যক্রম সম্পর্কে পুলিশকে বিস্তারিত তথ্য জানায়।
মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হিযবুত তাহরীরের কর্মীদের অবস্থান যাচাই, নতুন করে যুক্ত হওয়া কর্মীদের ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এছাড়া জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের আগে মসজিদে মসজিদে গিয়ে মুসল্লিদের কাছে বক্তব্য তুলে ধরা ও পরামর্শ চাইতে নগরীর ১৬ থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জঙ্গি সংগঠনটি বিভিন্ন তৎপরতার মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। তবে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক আছি।’
পুলিশ জানিয়েছে, গত ৭ জানুয়ারি কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের হাতে গ্রেপ্তার সাবকাত চট্টগ্রামে হিযবুত তাহরীরের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রধান। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সরকারবিরোধী লিফলেট। সাবকাত নগরীর ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির (ইউসিটিসি) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্র। পরে তার দেওয়া তথ্যে গত ১৪ জানুয়ারি সংগঠনের সদস্য ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ফাহাদ বিন সোলায়মানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাবকাত জানায়, হিযবুত তাহরীরের সাম্প্রতিক কৌশল অনেকাংশে ইসলামী ছাত্রশিবিরের মতোই। স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থীরাই তাদের টার্গেট। ‘ইসলামি খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পরে এসব কিশোর নেমে পড়ে দাওয়াত, লিফলেট বিতরণ ও পোস্টার লাগানোর কাজে। নগরী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের সাংগঠনিক অবস্থা ভালো জানিয়ে এ তরুণ পুলিশকে বলেছে, প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের অনেক কর্মী-সংগঠক আছে। নগরীর বিভিন্ন জনাকীর্ণ মোড়ে একত্র হয়ে তারা নিয়মিত পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত নেয়। কখনো সকালে খেলার ছলেও তারা সেরে নেয় সাংগঠনিক কাজ। আর নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করে ইমোসহ বিভিন্ন অ্যাপস, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়ানো যায়।
২০০০ সালে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে হিযবুত তাহরীর। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এই সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। ২০০১ সালে সংগঠনটি দেশের বিভাগীয় শহরগুলোকে টার্গেট করে। ২০০৫ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রামে দুই বিচারকের এজলাসে বইবোমা হামলা চালায় হিযবুত। উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী ও উচ্চবিত্ত তরুণদের টার্গেট করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসা সংগঠনটিকে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর থেকে গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে তারা।
সিএমপির কাউন্টার টেররিজম বিভাগের প্রধান উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হিযবুত তাহরীরের তৎপরতার বিষয়টা আমাদের নজরে এসেছে। ইদানীং দেখা যাচ্ছে কোনো জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তারা উসকানিমূলক পোস্টার-লিফলেট বিলি করে। সিএমপি বিষয়টা গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে।’
সাবকাত প্রসঙ্গে এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে লেখাপড়া করার সময়ই সাবকাতের মূলত হিযবুত তাহরীরের সংগঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পাথরঘাটা সেন্ট প্লাসিডস স্কুলের মাঠে খেলতে গিয়ে তাজোয়ার নামের নগরীর ফিরিঙ্গিবাজার এলাকার এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। পরে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে। দশম শ্রেণিতে পড়াকালেই সে সক্রিয় সংগঠকে পরিণত হয়। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেও সংগঠনের কাজে ব্যস্ত থাকায় এইচএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ ৩ দশমিক ৯ পায়।’
সাবকাত পুলিশকে জানিয়েছে, ফজরের নামাজের আগে কিংবা পরে নগরীর আদালত ভবন, কোতোয়ালি মোড়, নিউমার্কেট, কাজীর দেউড়ি ও লালখানবাজার এলাকায় পোস্টার লাগায় তারা। এসব জায়গায় দিনের বেলা হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে নগরীতে লাগানো পোস্টারের বেশিরভাগই হয়েছে তার নেতৃত্বে। পোস্টার লাগানোর সময় নৈশপ্রহরীদের কাছ থেকে কখনো বাধা আসেনি বলেও জানিয়েছে এ তরুণ।
সে আরও জানায়, সংগঠনের আলোচনা ও প্রচারে ক্ষমতাসীন সরকারকে হটিয়ে ‘খিলাফায় রাশিদাহ’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। তাদের লক্ষ্য গণতন্ত্রবিরোধী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দলে টানা। তবে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বোঝানো অনেক সহজ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রদেরই এ ক্ষেত্রে বেশি সক্রিয় দেখা যায়।
কাউন্টার টেররিজমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৪ সাল থেকে হিযবুত তাহরীরের নারী সংগঠন কাজ করছে। বাড়ছে তাদের নারীকর্মীর সংখ্যাও। দলের কর্মীদের দাবি, সবকটি বিভাগীয় শহরে তাদের সংগঠন রয়েছে। কোনো কর্মী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলে কিংবা সংগঠনের যেকোনো খবর প্রকাশের লক্ষ্যে কর্মীরা নিয়মিত গণমাধ্যম কার্যালয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পৌঁছে দিচ্ছে। এছাড়া লন্ডন থেকেও ই-মেইলে মিডিয়া অফিসে প্রেস রিলিজ পাঠানো হয়।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মতে, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের মাঠপর্যায়ে সদস্য সংগ্রহ ও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর কাজ করছে শীর্ষ সাত নেতা; সদস্যদের কাছে তারা কমান্ডো হিসেবে পরিচিত। তারা হলোÑ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর এলাকার আলী হোসেনের ছেলে আখতার হোসেন, নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার রেজাকপুর গ্রামের হানার রশিদের ছেলে মনিরুজ্জামান মাসুদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের খোয়াবাড়িয়া গ্রামের সাদিকুল ইসলামের ছেলে ওমর ফারুক, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের আফতারউদ্দিনের ছেলে জাহেদুল ইসলাম, চাঁদপুরের বাবুরহাটের শফিকুল ইসলামের ছেলে মাসুদ কাওসার এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কলেজপাড়ার মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে সাদ্দাম হোসেন ও একই জেলার ঝাউতলার শামসুল ইসলামের ছেলে মোজাম্মেল হক। তাদের মধ্যে ওমর ফারুক বর্তমানে কারাগারে।
