বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বছরে ১০ লাখ বই বেচে রকমারি

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:১৯ এএম

বই কেনার জন্যই ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসেছেন মৌরি। সারাদিন নীলক্ষেত, আজিজ মার্কেট, কাঁটাবন আর ফুটপাতের বইয়ের দোকান ঘুরে বেশ কিছু বই কেনার পরও বাকি থেকে যায় আরও কয়েকটি বই। উপায়ান্তর না দেখে অন্য আরেকজনের পরামর্শে রকমারি ডটকমে খোঁজ নেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সবগুলো বই-ই পাওয়া যায় রকমারিতে। মৌরি বুঝে গেলেন, নিতান্ত প্রয়োজন না হলে বই কেনার জন্য টাকা খরচ করে ঢাকায় আসার প্রয়োজন নেই। অনলাইনে অর্ডার করলে বাসায়ই পৌঁছে যাবে বই। ঢাকার বাইরে থেকে বিকাশের মাধ্যমে রকমারি থেকে কেনা বইয়ের মূল্য পরিশোধ করা যায়। প্রতিষ্ঠার মাত্র আট বছরের মধ্যেই বিরাট এক বইয়ের বাজারে পরিণত হয়েছে রকমারি ডটকম। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, মোটিভেশনাল, পাঠ্যবই, জীবনী, ভ্রমণ কিংবা অন্য যে কোনো বই কেনার বিশ্বস্ত মাধ্যম এখন এই প্রতিষ্ঠান। অনলাইনে বই বিক্রির ওয়েবসাইট করে বইয়ের বাজারে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছে।পরাগ মাঝির সরেজমিন প্রতিবেদন, ছবি : নূর

 

দুপুরবেলার রকমারি

 

রকমারির করপোরেট অফিসের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই পাওয়া গেল খাবারের গন্ধ। অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই তখন নিজ নিজ টেবিলে দুপুরের খাবার নিয়ে বসেছেন। এদের কেউ কেউ এক হাতে খাবার খাচ্ছেন, অন্যহাতে তখনো কিবোর্ডে টুকটাক কাজ সেরে নিচ্ছেন। ফেব্রুয়ারির বইমেলা শুরু হতে দুই সপ্তাহেরও কম সময় বাকি। মেলা উপলক্ষে হাজার হাজার বই বাজারে আসছে। এসব বইয়ের প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাভার ফটো ওয়েবসাইটে আপ করতে দেখা গেল অনেক কর্মীকে। জনসংযোগ কর্মকর্তা মিশু হালদারকেও পাওয়া গেল তার টেবিলেই। রকমারির অষ্টম বর্ষপূর্তি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে তার। তার কাছেই জানা গেল আট বছরে একটি মামুলি প্রতিষ্ঠানের বিশাল বাজার হয়ে ওঠার গল্প।

প্রথম পুঁজি টাকা নয়

রকমারির শুরুটা ছিল বই কিনতে গিয়ে মানুষ যে ধরনের সমস্যায় পড়ে, তার সমাধান বের করা। সাধারণত একটি বই খুঁজতে গিয়ে পাঠকরা বইয়ের দোকানের দ্বারস্থ হয়। অনেক সময় এমন হয় যে, কাক্সিক্ষত বইটি পাঠক খুঁজে পাচ্ছেন না। আবার রাজধানী ঢাকায় নীলক্ষেত, আজিজ মার্কেট, কাঁটাবন বাংলাবাজার ছাড়া বইয়ের তেমন কোনো বাজারও নেই। এসব এলাকায় অসংখ্য মানুষের ভিড় ঠেলে বই খুঁজতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না অনেকেই। বইয়ের দোকানগুলোতে পৌঁছাতে যানজটের কবলে পড়ে মানুষের সময় অপচয় হয়। দু-একটি বই কিনতে গিয়ে দেখা যায়, সারাটি দিনই খরচ হয়ে যায় এর পেছনে। মূলত বই কিনতে গিয়ে মানুষের এ ধরনের সমস্যার সমাধান বের করাই ছিল রকমারির প্রথম পুঁজি। তাদের তৈরি অনলাইন প্লাটফর্মে বই কিনলে ভিড়, যানজট কিংবা সময় অপচয়ের মতো বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

১৯ জানুয়ারি, ২০১২

বাংলাদেশে ইন্টারনেট জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে তখন। রকমারির উদ্যোক্তারা এই পথেই গ্রাহকের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। উদ্যোক্তাদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান সোহাগ প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান চেয়ারম্যান, আবুল হাসান লিটন এমডি, সিইও হিসেবে আছেন খায়রুল আনাম রনি এবং ডিরেক্টর হিসেবে আছেন যুবায়ের বিন আমিন ও এহতেশাম রাকিব। তাদের সবাই বুয়েট থেকে ডিগ্রি নিলেও চাকরির পেছনে না ছোটে নিজেদের ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলেন তখন। প্রাথমিক অবস্থায় অনলাইনে বই ব্যবসার হিসাবটি একেবারে শূন্য দেখালেও উদ্যোক্তাদের ছিল সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি। তারা জানতেন, কয়েক বছরেই দেশে ইন্টারনেটের নানামুখী ব্যবহার বেড়ে যাবে।

image

এমনটি হলে অনলাইন ই-কমার্সেরও বিশাল একটি ক্ষেত্র তৈরি হবে। এমন চিন্তা থেকেই রকমারি ডটকমের ওয়েবসাইট ডেভেলপ করলেন তারা। অল্প কিছু বই নিয়ে রাজধানীর আরামবাগে ছোট্ট একটি অফিস নিয়ে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে রকমারি ডটকম। মাত্র আট বছরের মধ্যে নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে প্রায় দেড়শো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এটি।

মধ্যবাড্ডার ছোট মির্জা

ছোট মির্জার আসল পরিচয় বের করার প্রাণান্তকর চেষ্ট করলেন রকমারির হেড অব কম্যুনিকেশন ও মার্কেটিং কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান সাদি। কারণ রকমারির সফলতার ইতিহাসে ছোট মির্জা নামটিও লেখা থাকবে সগৌরবে। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি দিবাগত রাতে রকমারি ডটকমের ওয়েরসাইট লাইভ করা হয়। আর ই-কমার্সের প্রতিষ্ঠান লাইভ করা মানেই ক্রেতার অর্ডারের জন্য অপেক্ষা করা। প্রথম দিন অর্থাৎ ১৯ জানুয়ারির দুপুর বেলায় (আড়াইটা) রকমারির ইতিহাসে প্রথম সফল অর্ডারটি করেন মধ্যবাড্ডা থেকে ছোট মির্জা নামধারী এক ব্যক্তি। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলনের লেখা ’৭১ শিরোনামের বইটি চেয়েছিলেন। সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বইটি তার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম ক্রেতা হিসেবে ছদ্মনামধারী ওই ব্যক্তির নামটি তাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বছরে ১০ লাখ

২০১২ সালে রকমারির যাত্রা শুরু হলেও ২০১৩ ও ১৪ সাল পর্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে হয় অনলাইনে বই বেচার প্রতিষ্ঠানটিকে। কারণ সে সময় পর্যন্তও ই-কমার্সে ভালো করে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি ক্রেতারা। রকমারির জন্যও ছিল শুরুর দিক। তাই তড়িৎ সেবা ও যে কোনো বই নিজেদের কাছে না থাকলেও সংগ্রহ করে দিয়ে ক্রেতাদের কাছে বিশ^স্ততা ধরে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করছিল প্রতিষ্ঠানটি। ‘কঠিন সংগ্রামের সেই দিনগুলো পেরিয়ে এসেছে রকমারি’, বললেন সাদি। তিনি জানালেন, শুরুর দিকে অর্ডার সংগ্রহ ও তা সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক অসংগতি ছিল। এসব অসঙ্গতি এখন নেই বললেই চলে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সেক্টরই সফলতার সঙ্গে সুশৃঙ্খল কাজ করে যাচ্ছে।

image

আর তাদের মিলিত প্রচেষ্টায় বছরে প্রায় ১০ লাখ বই গ্রাহকের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মাহমুদ আলম রাহাত জানালেন, বর্তমানে রকমারিতে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার অর্ডার আসে। বাংলা একাডেমির বইমেলা চলাকালীন এই অর্ডারের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। বেশির ভাগ অর্ডারেই একাধিক বই সংগ্রহ করেন ক্রেতারা। কারণ একটি বই সংগ্রহ করতে যে পরিমাণ সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়, পাঁচটি কিংবা ১০টির ক্ষেত্রেও একই চার্জ নেওয়া হয়। অনেক সময় একসঙ্গে দুই তিন হাজার বইয়ের অর্ডারও থাকে। কোনো কারণে ক্রেতাদের বই পছন্দ না হলে কিংবা বইয়ে কোনো ত্রুটি থাকলে বই ফেরত কিংবা বিকল্প বই দেওয়ার ব্যবস্থা করে রকমারি।

বইয়ের চাহিদা ছেলেদের বেশি

গল্প-উপন্যাস নয়, রকমারিতে মোটিভেশনাল বইগুলোর কাটতি সবচেয়ে বেশি। এর কারণ হিসেবে সাদি জানান, গল্প-উপন্যাসের বইগুলো ক্রেতারা সাধারণত লাইব্রেরি কিংবা ফুটপাত থেকেই সংগ্রহ করতে পারে। এ ছাড়া ধর্মীয় গ্রন্থগুলোরও বিশাল কাটতি রয়েছে রকমারিতে। গল্প-উপন্যাসের মধ্যে এখনো হুমায়ুন আহমেদের বইয়ের কাটতি সবচেয়ে বেশি। নতুন লেখকদের বইও আগের চেয়ে তুলনামূলক অনেক বেশি বিক্রি হচ্ছে। বিদেশি বই বিক্রির সংখ্যাটাও কম নয়। পরিসংখ্যান কর্মকর্তা রাহাত জানালেন, রকমারি থেকে বই সংগ্রহকারীদের মধ্যে ছেলেরাই এগিয়ে। বইয়ের অর্ডারে নারী ও পুরুষের মধ্যে শতকরা ব্যবধান ৪০-৬০। সারা দেশ থেকেই বইয়ের অর্ডার আসে। ঢাকার বাইরের অর্ডারগুলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাধারণত কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর সহযোগিতা নেওয়া হয়।

image

ঢাকার মধ্যে অর্ডার অনুযায়ী বই পৌঁছে দিতে নিজস্ব সাপ্লাই সিস্টেম গড়ে তুলেছে রকমারি। এই সিস্টেমে শতাধিক ডেলিভারিম্যান সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছে। মাহমুদুল হাসান সাদি জানালেন, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে চাহি বই পৌঁছে দিতে তারা সক্ষম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বইয়ের অর্ডার আসে। তবে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্য থেকেই সবচেয়ে বেশি অর্ডার আসে। সম্প্রতি বইয়ের পাশাপাশি স্টেশনারি থেকে শুরু করে কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক কিংবা সফটওয়্যারের ডেলিভারিও তারা শুরু করেছেন। বই হাতে পেয়েই সাধারণত ক্রেতারা এর মূল্য পরিশোধ করেন। তবে, বিকাশের মাধ্যমে অগ্রিম মূল্য পরিশোধের প্রবণতা বাড়ছে। রকমারি ডটকমের ওয়েবসাইটে বই অর্ডারের পাশাপাশি ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও প্রয়োজনীয় বই সংগ্রহ করা যায়।

বই রাশি রাশি

রকমারিতে বইয়ের কালেকশন দেখলে বই পাগল মানুষের চোখ কপালে উঠে যাবে। আরামবাগে রকমারির কয়েকটি বইয়ের গুদাম ঘুরে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ বইয়ের সংগ্রহশালা। শেল্ফের তাকে, কাগজের কার্টুনে কিংবা স্তূপাকারে পড়ে থাকতে দেখা গেছে অসংখ্য বই। গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পাঠ্যবই, দর্শন, সমাজনীতি, রাজনীতি, মোটিভেশনাল, ধর্মীয় থেকে শুরু করে যাবতীয় সব বিষয়ের দেশি-বিদেশি বই আছে রকমারির সংগ্রহে। পরিসংখ্যান কর্মকর্তা রাহাত জানালেন, তাদের গুদামগুলোতে একসঙ্গে তিন-চার লাখ বই রাখার সক্ষমতা আছে। প্রতিনিয়ত তাদের সংগ্রহে আসছে নিত্যনতুন বই। এগুলো আবার চলে যাচ্ছে ক্রেতাদের কাছে। বিদেশ থেকেও অসংখ্য বই আমদানি করা হয়। এগুলোর জন্য রয়েছে আলাদা গুদাম। দামি এসব বই যেন নষ্ট হয়ে না যায়, এ জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে গুদামের ভেতর আর্দ্রতা প্রতিরোধের জন্য সিলিকন দানা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কিছু বইয়ের তাক পলি কাগজেও মুড়িয়ে রাখা হয়। বিশ্বের নামকরা প্রায় সব লেখকের বই-ই আছে তাদের সংগ্রহে। আর কোনোটা যদি না থাকে তবে, তা সংগ্রহ করে দেওয়ার চ্যালেঞ্জও নেয় রকমারি।

ক্লাস সেভেন আরমান

বইয়ের গুদাম দেখতে গিয়েই পরিচয় আরমানের সঙ্গে। বয়স আনুমানিক ১৬ বছর। বিদেশি বইয়ের গুদামটি তার জিম্মায় থাকে। কোনো একটি বই চাইলেই চটপট নির্দিষ্ট তাক থেকে ছুঁ মেরে নিয়ে আসে এটি। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও মাঝেমধ্যে গুদামভর্তি বইয়ের পাতায় চোখ রাখে সে। তবে অন্যান্য কর্মচারীর মধ্যে রাসেল, আবদুর রহিম অনেক এগিয়ে। তারা হাজার হাজার বইয়ের সঙ্গে থাকতে থাকতে বেশ পড়–য়া হয়ে উঠেছে। রকমারির সঙ্গে সম্পৃক্ত মাহমুদুল হাসান সাদি, মিশু হালদার, মাহমুদ আলম রাহাত থেকে শুরু করে প্রায় সবাই প্রচুর পরিমাণে বই পড়েন। এদের অনেকে আগে থেকেই বেশ পড়–য়া। কেউ কেউ রকমারির বইয়ের রাজ্যে থাকতে থাকতে ঝানু পাঠক হয়ে উঠেছেন। বই নিয়ে মাঝেমধ্যে তাই তাদের মধ্যে জমে ওঠে গুরুগম্ভীর কিংবা হাস্যরসাত্মক আড্ডাও।

ভোগাচ্ছে পাইরেসি

 অনলাইনে বইয়ের বাজারটি এখন একচ্ছত্রভাবেই রকমারির দখলে। দীর্ঘ আট বছরে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে, এই সময়ের মধ্যে অনলাইনে বই ব্যবসায় অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী আসেনি। বই মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়াই রকমারির লক্ষ্য। বই প্রকাশক এবং লেখকদের সঙ্গেও নিবিড় সম্পর্ক রেখে চলে এই প্রতিষ্ঠান। তাই বইয়ের সব ধরনের পাইরেসির বিরুদ্ধে তারা। এমনটি হলে লেখকরা তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হন। শুধু নিজেদের উন্নয়ন নয়, রকমারি চায় যেন লেখকরাও বই লিখে উপার্জন এবং সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত