যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে অহরহ। কিন্তু ভুক্তভোগী নারীরা পাচ্ছেন না যথাযথ আইনি প্রতিকার। বিগত দুই দশকে এ বিষয়ে উচ্চ আদালত থেকে কয়েকটি রায়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এলেও তা বাস্তবায়ন হয়েছে সামান্যই। এতে উদ্বিগ্ন নারীসমাজ, মানবাধিকারকর্মী ও নারীনেত্রীরা। তারা বলছেন, যৌন হয়রানি রোধে এখন পূর্ণাঙ্গ আইনই যথার্থ সমাধান।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদসহ ১৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘জেন্ডার প্ল্যাটফর্ম’ এ আইনের বিষয়ে মতামত ও খসড়া অনুলিপি আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। এ ছাড়া কয়েকটি নারী সংগঠনও এ সংক্রান্ত খসড়া উপস্থাপন করেছে। কিন্তু আইনটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলীর এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যৌন হয়রানি বন্ধ ও তা প্রতিকারে উচ্চ আদালতের আলোচিত ও ঐতিহাসিক নির্দেশনাটি আসে ২০০৯ সালের মে মাসে। যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞাসহ যৌন হয়রানি রোধে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাসহ রায় দেয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানির ঘটনার প্রতিকার এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও অভিযোগ গ্রহণের উদ্দেশ্যে একজন নারীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের অভিযোগ কেন্দ্র গঠনের নির্দেশনা ছিল রায়ে।
কমিটি অভিযোগ পেলে তদন্ত ও অনুসন্ধানসাপেক্ষ দায়ী ব্যক্তিকে পুলিশে সোপর্দ করার পাশাপাশি প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা ছিল ওই রায়ে। রায়ে আরও বলা হয়, যতদিন পর্যন্ত যৌন হয়রানি রোধ ও তা প্রতিকারের জন্য জাতীয় সংসদে কোনো আইন প্রণয়ন করা না হবে ততদিন পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টের দেওয়া এ নির্দেশনা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হবে। নারীনেত্রীরা বলছেন, ১০ বছর পর বাস্তবতা হলো ওই নির্দেশনা পালন হয়েছে সামান্যই।
হাইকোর্টে ওই রিট আবেদনের শুনানিতে ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফাউজিয়া করিম ফিরোজ। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের জরিপে তিনটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ নির্দেশনা কার্যকর করেছে। এ ছাড়া কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নামমাত্র কমিটি গঠন করেছে। তিনি বলেন, ‘রায়ের পর গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন কর্মস্থলে আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি অনেকে কমিটিই করেনি। কেউ কেউ করলেও তা কার্যকর করেনি। অনেকে অভিযোগ পেলেও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।’
অ্যাডভোকেট ফাউজিয়া আরও বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই যৌন হয়রানি রোধ ও প্রতিকারে পূর্ণাঙ্গ আইনের দাবি জানিয়ে আসছি। এ সংক্রান্ত একটি খসড়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। যদি আইন করা হয় তাহলে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হবে। হয়রানিকারীরা সতর্ক হবে।’
সম্প্রতি ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকশনএইড পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থীই যৌন হয়রানি প্রতিরোধ-সংক্রান্ত কোনো কমিটির কথা জানে না। আর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা সম্পর্কে জানে না ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী; মাত্র ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী শুধু এ বিষয়ে শুনেছে। এতে আরও জানা গেছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ার ক্ষেত্রে কর্র্তৃপক্ষ বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অসচেতনতার অভাব রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৪ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
এ সম্পর্কে মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশনা একেবারেই যে পালন হয়নি তা বলব না। ওই মামলায় ১৯ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি প্রতিপক্ষ ছিল। রায়ের পর তারা কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। এমনকি গণমাধ্যম অফিসগুলোতেও কমিটি গঠন করেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইন থাকলে হয়রানিকারীরা ভয় পাবে। আর আইনটি প্রয়োগ করারও বাধ্যবাধকতা থাকবে। এতে করে এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে।’
১৯৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের সময় শাওন আক্তার বাঁধন নামে এক তরুণীকে লাঞ্ছনা ও যৌন হয়রানির পর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। পরে হাইকোর্টের আদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন, ওই এলাকায় এমন ঘটনায় ভুক্তভোগীদের জন্য হটলাইন স্থাপনসহ শিক্ষক-ছাত্র ও স্থানীয়দের নিয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে রিটকারী জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘হাইকোর্টের ওই নির্দেশনা পরে আর তেমন প্রতিপালিত না হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যৌন হয়রানির ঘটনাও কমেনি।’
যৌন হয়রানির প্রতিকার ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য ২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি এক রায়ে দেশের প্রতিটি থানায় একটি করে সেল গঠনের নির্দেশনা দেয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। সেলের দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে বলেও নির্দেশনায় বলা হয়েছিল। রিটকারী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাহিমা নাসরিন মুন্নী বলেন, ‘হাইকোর্টের এই রায়ে ১১টি নির্দেশনা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয় নির্দেশনাগুলো ন্যূনতম পালন করেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী আইন না হওয়া পর্যন্ত উচ্চ আদালতের রায়ই আইন। কিন্তু তা অবজ্ঞা করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সভানেত্রী আয়েশা খানম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যৌন হয়রানি রোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন যেমন দরকার তেমনি একটি পূর্ণাঙ্গ আইনও প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে একটি খসড়া আমরা আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। আশা করি সেই আলোকে একটি আইন প্রণয়ন হবে।’ ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়ক ও নারীনেত্রী খুশী কবির বলেন, ‘যৌন হয়রানি রোধে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ণাঙ্গ আইনের দাবি জানিয়ে আসছি। যদিও আমাদের দেশে আইনের অভাব নেই, প্রয়োগই বড় সমস্যা। তারপরও পূর্ণাঙ্গ আইন থাকলে আমরা প্রতিকারের জন্য সংশ্লিষ্টদের চাপ প্রয়োগ করতে পারব। আর রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দোষীদের শাস্তিও নিশ্চিত হবে।’
