রাষ্ট্র নামের নিপীড়নের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার গল্প নতুন কিছু নয়। রাষ্ট্র যেমন জনগণকে বসবাসের নিরাপত্তা দেয় আবার রাষ্ট্রের নিপীড়নের শিকার হয়ে মানবতাহীন জীবনযাপনও করছেন পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ। ‘জন্মভূমি’ তেমনই রাষ্ট্রহীন-দেশহীন মানুষের গল্প। রাষ্ট্রের অমানবিক নিপীড়নে কীভাবে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে পৃথিবীতে তারই গল্প তুলে ধরা হয়েছে ‘জন্মভূমি’ সিনেমায়। ‘জন্মভূমি (দ্য বার্থ ল্যান্ড) সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন প্রসূন রহমান। বেঙ্গল মাল্টিমিডিয়া লি. (আরটিভি)-এর ব্যানারে নির্মিত চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছেন আরটিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ আশিক রহমান। বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনযাপনের গল্প এই সিনেমার মূল উপজীব্য। অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা দর্শক হৃদয়ে ক্ষরণ জাগায়। সোফিয়া নামে এক অন্তঃসত্ত্বা নারী নিপীড়নের শিকার হয়ে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে। এখানে এসে পরিচয় হয় এক তরুণের সঙ্গে যে কিনা ১০ বছর আগে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে এসেছে। সোফিয়া ফিরতে চায় মাতৃভূমিতে। কিন্তু ফিরতে কি পারে সোফিয়া? এমন এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দেয় বিবেকবান পৃথিবীর বুকে। এই ছবিটির প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবির হলেও পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা দেশহীন মানুষের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। মানবিকবোধের বৈঠায় কড়া নেড়ে মাতৃত্বের সঙ্গে মাতৃভূমিকে যেন একই সুতোয় গেঁথে দেওয়া হয়। দর্শক হৃদয়ে তখন ক্ষরণ হয় সেই সব দেশহীন মানুষের জন্য, মাতৃভূমির জন্য। কিন্তু বিশ্ববিবেক কিংবা বিশ্বের প্রভাবশালী দেশের নেতাদের বিবেকে কি ক্ষরণ হয়? মানবিক বিপর্যয়ের এই বার্তাটিই যেন দিলেন নির্মাতা। জন্মভূমি ছবিটির শুরুতেই নির্মাতা কিছু তথ্য তুলে ধরেন। যেখানে দেখানো হয় মিয়ানমার সরকার ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক হত্যাকা- চালালে জীবন বাঁচানোর জন্য প্রায় ১১ লাখ শরণার্থী নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬৫ হাজার নারী গর্ভবতী ছিলেন এবং অনেকে মিয়ানমার আর্মি দ্বারা ধর্ষিত হন। বাংলাদেশ সরকার তাদের আশ্রয়ের জন্য কুতুপালংয়ে শরণার্থী শিবির তৈরি করে দেয়। তাদের এখন একটাই স্বপ্ন- নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া। ছবিটিতে সোফিয়া চরিত্রে অভিনয় করেছেন মডেল-অভিনেত্রী সায়রা আক্তার এবং যুবকের চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন রওনক হাসান। সাবলীল অভিনয়ে সায়রা এবং রওনক যেন মিশে গেছেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। ছবিটির গল্প এগিয়েছে অনেকটা বর্ণনাত্মক রীতিতে। ফলে কথা প্রধান এই ছবিটির ভাষাগত জটিলতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে সাবটাইটেল। ফলে চরিত্রগুলো আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললেও সব শ্রেণির দর্শকের জন্য বোধগম্য হয়ে উঠে ছবিটি। পাশাপাশি রোহিঙ্গা নিপীড়নের এই চিত্র বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের মানবিক অবস্থানও তুলে ধরে। ফলো রাষ্ট্রহীন মানুষের মানবিক বিপর্যয়ের দলিল হয়ে ওঠে প্রসূন রহমানের এই ছবিটি। এই সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রওনক হাসান, সায়রা আক্তার জাহান, সংগীতা চৌধুরী, অঙ্কন চাকমা, জয়নাল জ্যাক, পামেলা কেচার, নাসির উদ্দিন’সহ আরও অনেকে। কিছুদিন আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে ‘জন্মভূমি- দ্য বার্থল্যান্ড’। আর সবশেষ গত ১৪ জানুয়ারি ‘সপ্তদশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এ ছবিটির প্রদর্শনী হয়।
×
