সব বিনিয়োগেই বাড়তি সুবিধা দিচ্ছি

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০১:০৮ এএম

১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে ২০১০ সালে বেজা গঠিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত কতটির কাজ শুরু করতে পেরেছেন?

দেশের ১৬-১৭ কোটি মানুষের চাহিদার কথা বিবেচনা করে সরকার শুধু রপ্তানিনির্ভর শিল্পপার্কের বদলে ২০১০ সালে অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন-এসইজেড) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৫ সালে ১০০টি এসইজেড করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তখন ৭৫ হাজার একর জমি নিয়ে একটি ল্যান্ড ব্যাংক স্থাপনের পরিকল্পনা করলাম। গত চার বছরে আমরা ৮৮ টি ইকোনমিক জোনের সাইট যাচাই-বাছাই করেছি। ৭টা প্রাইভেট ইকোনমিক জোন সম্পূর্ণরূপে চালু হয়েছে। সেগুলোতে শিল্প-কারখানা হয়েছে ১৯টি। আরও বেশ কয়েকটি কারখানা স্থাপনের কাজ চলছে। আগামী ২ বছরে আরও ১০টি কারখানা চালু হবে। সরকাার উদ্যোগে মিরসরাই, ফেনী, সীতাকু- নিয়ে ৩০ হাজার একর জমিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর নামে নামে বড় শিল্পশহর গড়ার কাজে হাত দিয়েছি। সেখানে ইন্ডিয়ান ইকোনমিক জোন স্থাপনের কাজও চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে, ১৬৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এ নির্মাণকাজ এক বছরের মধ্যেই শেষ হবে। শেখ হাসিনা সরণী নামে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ চারলেন সড়ক নির্মাণ করছে। শেখ হাসিনা সরোবর হচ্ছে। প্রতিটা সরোবর হবে ১০০ থেকে ১৫০ একরের। অনেকগুলো পর্যটন কেন্দ্র করছি। এরমধ্যে সাবরাংয়ে প্রায় এক হাজার একর জমিতে প্লট বরাদ্দ শুরু করেছি। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সুবিধা ও মানসম্পন্ন পানি সরবরাহসহ সেখানে পর্যটনের আধুনিক সব সুবিধা থাকবে। সরকারি মালিকানাধীন ২০টি এসইজেড স্থাপনের কাজ পুরোদমে চলছে। বেসরকারি খাতে আরও ২১টি উন্নয়নের পর্যায়ের আছে। ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের তিনটি এসইজেড হচ্ছে। জাপানের জন্য আড়াইহাজারে এক হাজার একর জমিতে এসইজেড হচ্ছে। চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য চট্টগ্রামের আনোয়ারায় এসইজেড স্থাপনের কাজ চলছে।

চীন, জাপান ও ভারতের জন্য তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক জোনগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি কতটুকু?
জাপান ইকোনমিক জোনের জন্য ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণ শেষ করেছি। বাকি ৫০০ একর অধিগ্রহণের কাজ চলছে। জাপানের বিখ্যাত কোম্পানি সমোতুমো করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করেছি। তা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন শেষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন পেলে যৌথ উদ্যোগে কাজ শুরু করব। ২০১৯ সালেই ভূমি উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন হবে। চাইনিজ জোনগুলোতে ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে, অফিস ভবনও তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী খুব শিগগিরই এটা উদ্বোধন করবেন বলে আশা করছি।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর কতটা আগ্রহ দেখতে পাচ্ছেন?

ইউরোপ-উত্তর আমেরিকা থেকে খুব বেশি বিনিয়োগ আসবে বলে আমি মনে করি না। প্রযুক্তি নির্ভর শিল্পপণ্য ও সফটওয়্যার রিলেটেড কাজগুলো এখন চীন, ভারতই করছে। ভারতের ব্যাঙ্গালুরু, সল্ট লেক ও হায়দারাবাদে অনেকগুলো বড় বড় আইটি পার্ক হয়েছে। আগামী দিনে আমাদের দেশেও হবে। আমাদের দেশে ভারত, চীন, জাপান থেকে বিনিয়োগ আসবে। কারণ জাপানে শ্রমিকের খুব সংকট আছে।

বর্তমান সরকারের মেয়াদে কতটা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন?
প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা করা হয়েছে ১৫ বছরের জন্য। এই সময়ে মিরসরাই, ফেনী ও সীতাকুন্ড- নিয়ে গড়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর একেবারেই বাস্তবে রূপ নেবে। এরমধ্যে সেখানে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আগামী ৫ বছরে পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নেবে। প্রাইভেটজোনগুলোও বেশ ভালো এগোচ্ছে। সেখানে হোন্ডার মতো প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেল উৎপাদন করছে। মিরসরাই ও মহেশখালীতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে বেশ কিছু বড় বড় শিল্প গড়ে উঠবে।

বেজার ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার থেকে কতগুলো সেবা দেওয়া হচ্ছে? বাকি সেবাগুলো কবে নাগাদ এ সেন্টার থেকে দেওয়া সম্ভব?

বেজাই প্রথম ওয়ানস্টপ সার্ভিস দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এসেবার ক্ষেত্রে অন্য সংস্থাগুলোকেও আমরা অন্তর্ভুক্ত করেছি। সেন্টারের ইন্টেরিয়র ডিজাইন চলছে। আশা করছি, ফেব্রুয়ারির মধ্যে এটা শেষ হবে। তখন সেন্টারটি চালু করা হবে। আমরা এখন অনলাইনে ১১টি সেবা দিচ্ছি। সেন্টার চালু হলে সেবা সংখ্যা বাড়বে। পর্যায়ক্রমে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আওতায় বেজা ১২৫-১২৬টি সেবা দেবে।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস, বিদ্যুৎ সংযোগ দ্রুত প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা। প্রত্যাশা পূরণে বেজার লক্ষ্য কী?
গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রাধান্য পাবে। বিদ্যুতেও কোনো সমস্যা নেই। দেশের সবচেয়ে বড় জোন মিরসরাইয়ের জন্য সেখানেই নিজস্ব বিদ্যুকেন্দ্র হচ্ছে। ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে গ্যাসের পাইপলাইন আনা হচ্ছে। প্রত্যেকটি জোনে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।

এসইজেডে বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়তি কী সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব থাকবে বেজার?
সব কিছুতেই বাড়তি সুবিধা দিচ্ছি আমরা। অন্য জায়গায় গ্যাসের লাইন নিতে অনেক কষ্ট হয়। বেজার কাছে সহজেই সেটা পাওয়া যাচ্ছে। অন্য জায়গায় বিদ্যুৎ নিতে অনেক সময় লাগছে, আমাদের এখানে একদিন বা দুই দিনের মধ্যে সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ভালো ও মানসম্পন্ন রাস্তাঘাট দিচ্ছি। টেলিযোগাযোগটাও সহজে পাওয়া যাচ্ছে বেজার কাছ থেকে। অন্য জায়গায় জমির অনেক দাম, এসইজেডে কম দাম। অন্য জায়গায় মাস্তানি আছে, এখানে কোনো মাস্তানি নেই।

বিনিয়োগে কোন কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে?

আমাদের কাছে সব খাতই সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে উন্নত প্রযুক্তির বিনিয়োগকে আমরা বেশি গুরুত্ব দেব। এর মধ্য দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সহজ হবে।

মিরসরাইয়ে কী পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে? বিশ্বের নামকরা কোনো ব্রান্ড সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে কি না?

জাপানের সোমিতুমো করপোরেশন পৃথিবীর বিখ্যাত ডেভেলপার। তারা নারায়ণগঞ্জে এসেছে। আনোয়ারাতে এসেছে চায়না হারবাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং। হীরানন্দা আসছে। ভারতের আদানি গ্রুপ মিরসরাইতে ইকোনমিক জোন করবে। ইংল্যান্ডের কোম্পানি বার্জার এসেছে। ইন্ডিয়ান কোম্পানি এশিয়ান পেইন্টস, জাপানের কোম্পানি সুজিত এসেছে। চীনের বড় কোম্পানি জেজিয়ান জিংরুং এসেছে। এরকম অনেকগুলো বিদেশি কোম্পানি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইকোনমিক জোনে এসেছে। আমরা আশা করছি, এ বছর একটা বিদেশি কোম্পানি নির্মাণ শুরু করে উৎপাদনে যাবে।

১০০টি ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার কাজ আগামী কত বছরের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে?
যে কোনো বড় কিছু বাস্তবায়ন করতে হলে একটা স্বপ্ন নিয়ে এগোতে হয়। এটা সে ধরনের একটা টার্গেট। সেক্ষেত্রে ১০০টা হতে পারে। ১০০টার বেশি হতে পারে। কমও হতে পারে। যেমন মিরসরাইয়ে আমরা যেটা করছি এটা নিজেই ১০০টা জোনের সমান। কারণ আমরা যদি ইপিজেডের বিষয়টা দেখি, তাহলে ৩৮ বছরে ২০০ একর জমি ডেভেলপ করেছে। আর আমরা চার বছরের মধ্যেই মিরসরাইয়ে ৩০ হাজার একর জমি ডেভেলপ করে বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরী স্থ্পান করছি। একটা জোনই প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মহেশখালীতে ২৫ থেকে ২৭ হাজার একর জমি নিয়ে কাজ করছি। আমরা ৭৫ হাজার একর জমির টার্গেট নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। এখন আমরা যেভাবে এগুচ্ছি তাতে মনে হচ্ছে ২ লক্ষ একর জমিতে কাজ করতে পারব ১৫ বছরে। ইকোনমিক জোনের সংখ্যাটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, কতটুকু জমি শিল্পায়নের জন্য উপযুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে, সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত