এক বছরের ব্যবধানে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ কমে গেছে। মূলত বেসরকারি ব্যাংকগুলো পিছিয়ে পড়ায় এ খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে দেশের ব্যাংকগুলো মোট ১০ হাজার ২৩১ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
কৃষিঋণ বিতরণ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বেসরকারি ব্যাংকের তারল্য সংকট। চলতি অর্থবছর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হজার ৩৪৪ কোটি টাকা। তবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের লক্ষ্যমাত্রার ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে। মূলত তারল্য সংকটের কারণেই বেসরকারি ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। একই সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো অর্থবছরের প্রথমার্ধে লক্ষ্যমাত্রার ৭৩ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। সরকারি ব্যাংকগুলোও পিছিয়ে নেই কৃষিঋণ বিতরণে।
চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। কৃষি খাতে বিতরণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তার মধ্যে ৫২ শতাংশ বিতরণ করার কথা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর। এর বাইরে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক বিতরণ করবে ৩০ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংক বিতরণ করবে ১৫ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংক বিতরণ করবে ৩ শতাংশ ঋণ।
চলতি অর্থবছর বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। এরমধ্যে অর্থবছরের প্রথমার্ধে এ প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দিয়েছে ৫ হাজার ১৫৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ কম।
কৃষি খাতের ঋণের ৬০ শতাংশ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিতরণ করা হবে শস্য খাতে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত পাবে অন্তত ১০ শতাংশ। বাকি অর্থ কৃষি যন্ত্রপাতি, দারিদ্র্য বিমোচন, ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ, টার্কি পালন ও অন্যান্য খাতে বিতরণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮ সাল ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে কৃষি খাতে মোট ব্যাংকঋণ রয়েছে ৪০ হাজার ১১২ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ৪০ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধ শেষে কৃষি খাতে সরকারি ব্যাংকগুলো মোট ৩০ হাজার ৩১২ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরে বিদেশি বাংকগুলোর জন্য ৫৮১ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হলেও প্রথম ছয় মাসে ৭৩ শতাংশের বেশি বিতরণ করেছে এ প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। চলতি প্রথমার্ধে সরকারি ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রার ৫১ দশমিক ৩৯ শতাংশ ঋণ দিয়েছে।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে কষিঋণ বিতরণে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলো। চলতি অর্থবছরে মধুমতি ব্যাংকের জন্য ৫৬ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও প্রথমার্ধে ব্যাংকটি এ খাতে কোনো ঋণই বিতরণ করতে পারেনি। একই সময়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ১২৩ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ১ কোটি ২০ লাখ টাকা কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ করতে পেরেছে। নতুন আসা সীমান্ত ব্যাংকেরও একই অবস্থা। পূরনো বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে কৃষিঋণ বিতরণে পিছিয়ে আছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট, শাহজালাল ইসলামী, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, এনসিসি, সাউথ ইস্ট, সিটি ও ট্রাস্ট ব্যাংক। এসব ব্যাংক চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ৭ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কৃষিঋণ বিতরণ করতে পেরেছে।
এদিক কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ কমলেও আদায় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে এ খাতে ঋণ আদায় হয়েছে ১১ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা, যা কৃষি খাতের মোট ঋণের ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে কৃষিঋণ আদায় হয়েছিল ১০ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, যা সে সময়ে দেওয়া মোট কৃষিঋণের ২৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে ঋণ আদায়ের পাশাপাশি এ খাতে খেলাপির পরিমাণ সামান্য বেড়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথমার্ধে কৃষি খাতে খেলাপি ছিল মোট ঋণের ১৬ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ১৬ দশমিক ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর কৃষি ও পল্লী খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। কিন্তু বিতরণ করা হয়েছে তার চেয়েও বেশি, ২১ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। সে সময় মোট ৩৯ লাখ ৬২ হাজার ৫০৮ জনকে ওই ঋণ দেওয়া হয়।
