রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি মামুনুর রশিদ ওরফে রিপন ওরফে রেজাউল করিম ওরফে আবু মুহাজিরকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। পলাতক এই আসামি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর নেতা এবং দলটির অর্থ, অস্ত্র ও বিস্ফোরকের জোগানদাতা বলে জানিয়েছেন র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান। রিপনকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ খান জানান, গত শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে গাজীপুর জেলার বোর্ডবাজার এলাকা থেকে রিপনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৫৫ টাকা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া একটি ডায়েরি, ৪টি খসড়া মানচিত্রও জব্দ করা হয়।
রবিবার রিপনকে আদালতে হাজির করে সবুজবাগ থানায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের এক মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র্যাব-৩ এর সহকারী পুলিশ সুপার মো. কফিলউদ্দিন। শুনানি শেষে বিচারক তাকে পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিপনের পক্ষে কোনো আইনজীবী এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। রাজধানীর বাসাবো বালুর মাঠে জঙ্গিদের ‘গোপন বৈঠকের’ ঘটনায় গত বছরের এপ্রিলে দায়ের করা ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি রিপন।
মাহমুদ খান বলেন, রিপনকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তার বাড়ি বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম থানার শেখেরমাড়িয়া গ্রামে। বাবার নাম মৃত নাছিরউদ্দিন। সে ১৯৮৮ সালে জন্মগ্রহণ করে। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তার বাবা স্থানীয় মাদ্রাসায় ভর্তি করেন। পরে নওগাঁ ও ঢাকার মিরপুরের বিভিন্ন মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে। সর্বশেষ ২০০৯ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাদ্রাসাতুল দারুল হাদিস থেকে দাওরা-ই-হাদিস সম্পন্ন করে রিপন। বগুড়ার সাইবার টেক নামে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অফিস অ্যাপ্লিকেশন কোর্স সম্পন্ন করে ওই প্রতিষ্ঠানেই চাকরি শুরু করে।
র্যাব জানায়, রিপন জানিয়েছে, সাইবার টেকে চাকরিরত অবস্থায় ২০১৩ সালে পূর্ব পরিচিত ডা. নজরুলের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়। ধীরে ধীরে সে জেএমবির প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। জেএমবিতে অন্তর্ভুক্তির পর নজরুল তার সাংগঠনিক নাম দেয় ‘রিপন’। আগে সে ‘রশিদ’ নামে পরিচিত ছিল। প্রাথমিকভাবে রিপনের দায়িত্ব ছিল ইয়ানতের (চাঁদা) সংগ্রহ করে নজরুলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। নজরুল তখন জেএমবির একাংশের আমির ছিলেন। আস্থাভাজন হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যেই রিপন নজরুলের অংশের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
র্যাবের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, নবনিযুক্ত জেএমবির আমির সারোয়ার জাহান সংগঠনের জন্য নতুন করে অর্থ সংগ্রহ ও দাওয়াতি কার্যক্রম বেগবানের উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে রিপন বিকাশের দোকান লুট করে ৬ লাখ টাকা, এক সিগারেট বিক্রেতার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা ছিনতাই ও গাইবান্ধায় অপর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১ লাখ টাকাসহ মোট ৮ লাখ টাকা সারোয়ারের কাছে পৌঁছে দেয়। সারোয়ারের মাধ্যমে জঙ্গিদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও মদদদাতা আব্দুল্লাহর সঙ্গেও তার পরিচয় হয়।
মুফতি মাহমুদ খান বলেন, জেএমবি ওই অংশের সঙ্গে তামীম চৌধুরীর অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও তথ্য দিয়েছে রিপন। সে জানায়, ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তামীম ও সারোয়ারের মধ্যে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে সারোয়ারকে দলের আমির নির্বাচন করা হয়। তার সাংগঠনিক নাম দেওয়া হয় ‘শায়েখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ’। ওই বৈঠকে সাদ্দাম ওরফে কামাল, শরিফুল ওরফে রাহাত, রিপনসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিল। সে সময় রিপন সংগঠনটির শুরা সদস্য মনোনীত হয়। শুরা সদস্য হিসেবে রিপনের দায়িত্ব ছিল অর্থ সংগ্রহ, সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহ করা। রিপন জানায়, শুরা সদস্যরা হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকত। সংগঠনের সিদ্ধান্তে রিপনের নেতৃত্বে একটি দল ২০১৬ সালের এপ্রিলে প্রতিবেশী একটি দেশে গিয়ে অর্থ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করে।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে হলি আর্টিজান বেকারিতে ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে জবাই ও গুলি করে হত্যা করা হয়। সরাসরি হামলায় অংশ নেয় পাঁচ তরুণ। আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে থাকা ওই মামলার পলাতক দুই আসমির একজন মামুনুর রশিদ রিপন।
