‘নয় মাস কাজ করছি। সাত মাসের বেতন দেয়নি। খাবার দেয় না, পানি দেয় না, তার ওপর দিন-রাত মারে। বউ মারে, বেটি মারে, স্বামীও মারে।’ গতকাল রবিবার রাতে হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রবাসজীবনে নির্যাতনের শিকারের কথা বলছিলেন সৌদিফেরত আমেনা বেগম (ছদ্মনাম)।
গত বছরের মার্চে সৌদি আরবের রিয়াদে যান দিনাজপুরের ৫০ বছর বয়সী এই নারী। পরিবারে সচ্ছলতা আনতে প্রবাসে গিয়ে উল্টো নির্যাতনের মুখে অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছেন। তিনি বলেন, ‘সকাল ৬টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করি। কিল, ঘুসি সহ্য করতে না পেরে দুই মাস আগে পালিয়ে যাই অ্যাম্বাসিতে। সেখানেও শান্তি নাই। ম্যালা নারী সেখানে আছে। তারা সবাই ফেরার জন্য কান্নাকাটি করে।’
প্রায় একই কথা বললেন বগুড়ার ৬৫ বছর বয়সী জাকিয়া বেগম (ছদ্মনাম)। তিনি জানান, সৌদি আরবে খুবই খারাপ অবস্থায় আছে বাংলাদেশের নারী ও পুরুষ কর্মীরা। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘বাবা, যামু কোথায়? কফিল (নিয়োগকর্তা) মারে, পুলিশের কাছে গেলে টাকাপয়সা নিয়া চড়-থাপ্পড় দিয়া বিদায় দেয়। শেল্টার হোমেও দাম নাই আমগোর।’ তার অনুরোধ, কোনো মেয়ে যেন সৌদি আরবে না যায়। সম্প্রতি আমেনা ও জাকিয়ার মতো সৌদি আরব থেকে ৮০ জন নারীকর্মী প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফেরেন।
বিমানবন্দরে দেখা যায়, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা থেকে আসা বৃদ্ধ গোলাপ মিয়া নয় বছরের শিশুকন্যার হাত ধরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, ‘দুই মাস আগে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে আমার বউ সৌদি আরবে যায়। যাওয়ার পর থিকাই ফোন দিয়া কাঁদত। বাড়িওয়ালার মারধরে অসুস্থ হইয়্যা গেছে। আইজক্যা ফিরা আইতাছে। না খাইয়া মরলেও আর পাঠামু না।’
গুরুতর অসুস্থ তিন নারীকে বিমানবন্দর থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘সৌদিফেরতদের মধ্যে প্রতিবারই তিন-চারজন করে গুরুতর অসুস্থ নারী পাওয়া যায়।’ সৌদি আরবে নারীকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
প্রবাসফেরত নারীরা জানান, কাজের সময় একটু এদিক-ওদিক হলেই নির্যাতনের মুখে পড়তে হয় তাদের। অনেক ক্ষেত্রে লোহা গরম করে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। ঘরে তালা মেরে দু-তিন দিন না খাইয়ে রাখা হয়। নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় দূতাবাসে পালিয়ে আসেন। পরে দূতাবাস ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাহায্যে দেশে আনা হয় তাদের। তারা জানান, এখন পর্যন্ত দেশে ফেরার অপেক্ষায় দূতাবাসের সেফহোমে বাস করছেন প্রায় ৫০০ নারী।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০১৭ সালে অভিবাসী নারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আছেন সৌদি আরবে। নির্যাতনের মুখে প্রতিবছর দেশটি থেকে নারীকর্মী ফেরতের ঘটনা ঘটলেও গত বছর এ হার তুলনামূলক বেড়ে যায়। ২০১৮ সালে ১ হাজারের বেশি নারী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ফিরেছেন প্রায় ৪ শতাধিক নারী।
