রাজনীতি অর্থ রাষ্ট্রশাসন কিংবা রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি, যদিও শব্দটির ইংরেজি ভাষ্য ‘পলিটিকস’ উদ্ভূত হয়েছিল গ্রিক শব্দ ‘পলিটিকা’ থেকে, যার অর্থ নগর অথবা নাগরিকসংক্রান্ত, আজকাল শব্দটি রাষ্ট্রপরিচালনার নীতির সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে। ফলে রাষ্ট্রপরিচালনায় অদক্ষতা কিংবা ব্যর্থতা থেকে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদকেই বলা যায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল তৎপরতা। যেসব দেশে মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো সম্ভব হয় না, সেসব অপূরণীয় চাহিদার কারণ দেশের সহজাত দারিদ্র্য হলেও তার দায়ভার সরকারের ওপরই বর্তায়। সে জন্য রাজনৈতিক গোলযোগ, সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ ও আন্দোলন ইত্যাদি একটা দরিদ্র দেশের সহজাত বৈশিষ্ট্য। এ কারণেই অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত একটা দেশের সরকার কখনোই জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে না।
একটা বিষয় বিস্মৃত হওয়া উচিত হবে না যে, সাধারণ মানুষ কেবল তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই সরকার পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেয় না, তাদের কল্পনায় সুশাসনের যে চিত্র থাকে, সেই সুশাসন কামনা করেই তারা সরকার নির্বাচিত করে। এই সুশাসন কারও কাছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার দক্ষতা, কারও কাছে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, আবার কারও কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত রাখার সামর্থ্যকে বোঝায়। বলাবাহুল্য, সীমিত সম্পদসহ জনবহুল ও নিম্ন আয়ের একটা দেশে গণমানুষের এসব চাহিদা মেটানো কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হয় না।
প্রয়াত রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘এমপি কি কাঁচকি মাছের ভাগা? সবাই এমপি হতে চায়। দেশজুড়ে রাস্তায় রাস্তায়, নগর-শহর থেকে গ্রামীণ জনপদে ডিজিটাল ব্যানার, রঙিন পোস্টারে ঝুলছে যার তার ছবি ও নাম। অমুককে সংসদে দেখতে চাই। চাওয়া দূরে থাক, এদের কাউকে মানুষ চিনে না পর্যন্ত। সংসদ সদস্য হওয়ার মতো যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা মানুষের মধ্যে দূরে থাক, অনেকের নিজ দলেও নেই।’
ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার কাউন্সিলর হওয়ার মতো জনপ্রিয়তা নেই। রাজনৈতিক অতীত নেই, গণমানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। ছাত্র রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের গৌরব নেই, ক্যারিশমা নেই। তবু নিজে নিজে টাকার জোরে এসব ডিজিটাল, ব্যানার ও পোস্টারের দৃশ্যে চারদিক এমনভাবে সাজিয়েছে, চোখ মেলে তাকানো যায় না। মানুষ বিরক্ত হচ্ছে, ক্ষুব্ধ হচ্ছে। তাতে তাদের কিছুই হয় না। মূল্যবোধহীন রাজনীতির ধারাবাহিকতায় এটি চলছে। দল মনোনয়ন দেবে না নিশ্চিত হয়েও তারা এমনটি করছে। একসময় আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক আদর্শ, চিন্তা ও চেতনায় লালন করে অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতায় যারা গণমানুষের আস্থা অর্জন করতেন, কেবল তারাই দলের মনোনয়ন চাইতেন।
দেশের রাজনীতির এ ধরনের পালাবদল ব্যাপকভাবে প্রথম দেখা যায় ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছিল দলের ত্যাগী নেতাদের। ভঙ্গুর বিএনপি টাকাওয়ালাদের ধরে ধরে এনে মনোনয়ন দিয়েছিল। তারপর থেকে ঠিকাদার, টেন্ডারবাজ থেকে শুরু করে সমাজকে কলুষিত করার খলনায়করা সংসদে আসতে থাকেন। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যোগ দেন ব্যবসায়ীরা। সৎ, পরিচ্ছন্ন ইমেজের আদর্শবান রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা অসহায় হয়ে পড়েন। সংসদে এমন ব্যক্তিদের দেখা যায়, যাদের কার্যপ্রণালিবিধি পাঠ করা বা তা অনুসরণ করার যোগ্যতাও নেই। এমনকি তাদের কারও কারও সংবিধান পড়া ও বোঝার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই।
গণতন্ত্রের অধিকারের এই সুযোগে তারাই এগিয়ে আছে। তাদের ছায়ায় ছায়ায় নষ্টদের ডিজিটাল ব্যানার, পোস্টারে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশ। কেউ ভালোবাসুক আর নাই বাসুক, কেউ পছন্দ করুক আর নাই করুক, লাজলজ্জার অভিধান তাদের কাছে নেই। এমপি মনোনয়ন চাইলে পাক না পাক, নির্বাচিত এমপির কাছে গুরুত্ব বাড়বে, স্থানীয় প্রশাসন পাত্তা দেবে, ঠিকাদারি, চাঁদাবাজির প্রসার ঘটবে। দলের নেতৃত্বেও অবস্থান সুদৃঢ় হবে। কত স্বপ্ন! মানুষের কল্যাণ নয়, নিজের উন্নয়নই তাদের লক্ষ্য। এদের আস্ফালনে, কর্মকাণ্ডে মূল্যবোধসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন, না হয় ঘরে উঠে গেছেন। প্রকৃত রাজনৈতিক নেতাকর্মী যারা আদর্শবোধ নিয়ে রাজনীতি করতেন, করছেন গণমানুষের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা থাকলেও শোডাউনের অসুস্থ রাজনীতির অর্থ খরচের দাপটের কাছে তারা কোণঠাসা।
দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী, শ্রমজীবীদের পক্ষে যারা রাজনীতি করেন, তারা আসলে গণমানুষের রাজনীতি করেন। কিন্তু আমাদের দেশে গণমানুষের রাজনীতি জনপ্রিয় হয়নি। জনপ্রিয় হয়েছে মধ্যবিত্ত সুবিধাভোগীদের নানা প্রলোভনে আকৃষ্ট করার রাজনীতি। আমাদের দেশে বেশির ভাগ দলই মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিভূ। তাদের নীতি-কর্মসূচি-ঘোষণাÑ সবকিছু মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করেই। আমাদের দেশে এ মধ্যবিত্তরাই সমাজের মূল চালিকাশক্তি। তারা সরকারি দল থেকে নানাভাবে সুবিধা গ্রহণ করে। এ সুবিধার বলে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হয়। কিছু মানুষ তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। হতদরিদ্ররা ছিটেফোঁটা হলেও এই টাকা-পয়সার ভাগ পায়। তারাই জনমত গঠনের মূল নিয়ামক। তাদের কথাতেই সাধারণ মানুষ এখনো নাচে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার বর্তমানে এ এক মস্ত বড় সুবিধা। অভাবী মানুষ, লোভী মানুষকে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দলে ভেড়ানো হয়। তারপর এরা দলের স্বার্থে কাজ করে। তারা নিজেরাই একটা বিশেষ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। প্রথমে নেতার হাতা, পরে নিজেরাই নেতা বনে যায়। এভাবে ক্ষমতার রসগোল্লা ও রস মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেন্দ্রিক রাজনীতিকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা অত বেশি গণতন্ত্র, সুশাসন, বাক্স্বাধীনতা, সুদূরপ্রসারী জাতীয় লাভ-ক্ষতি দেখে না। তারা নগদ-নারায়ণে বিশ্বাসী। ক্ষমতাসীনরা এ ব্যাপারে তাদের প্রতারিত করে না।
আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ বা গণমানুষের স্বার্থে আন্দোলন খুব একটা হয় না। বেশির ভাগ আন্দোলনের মূল কথা হচ্ছে : ওকে হটানো, একে ওঠানোর ‘আন্দোলন’। এ ধরনের আন্দোলন কোনো দল বা পার্টি-উৎসারিত ও নিয়ন্ত্রিত এবং সেই কারণে অনেক শৃঙ্খলিত। প্রচুর মানুষ যোগ দিলেও ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’র পরিমাণ সেখানে কম। আমাদের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এসব আন্দোলন জনপ্রিয় এবং স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতার পর নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল চোখে পড়ার মতোই।
এখন অবশ্য রাজনীতিতে আন্দোলন এবং জনপ্রিয়তার চরিত্র অনেকটাই ভিন্ন। আমাদের দেশে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালোদা জিয়া উভয়কেই ‘জনপ্রিয়তাবাদী’ (‘পপুলিস্ট’) নেত্রী বলা চলে। জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার কোনো নির্দিষ্ট বাঁধাধরা, অনমনীয় মতাদর্শ ও কার্যক্রম নেই। জনপ্রিয়তাবাদের কেন্দ্রে রয়েছে মোটা দাগের কিছু বুলি, যা বিশেষ কোনো শ্রেণি বা গোষ্ঠীর কথা বলে না। সামগ্রিকভাবে (অনেক সময়ই ধোঁয়াটে) মানুষ বা জনগণ বা পিপলের নমনীয় ধারণা এই রাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এই নমনীয়তার ফলে, বাম, ডান বা মধ্যপন্থিÑ যেকোনো নেতা বা তার রাজনীতিই এই গোত্রভুক্ত হতে পারে।
এই আলগা মতাদর্শের পাশাপাশি থাকে কিছু জনমোহিনী স্লোগান। যেগুলো শুনতে বেশ, কিন্তু তলিয়ে ভাবলে তাদের নির্দিষ্ট মর্মার্থ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এ জন্যই এদের ‘ফাঁপা অর্থের বাহক’ (‘এম্পটি সিগ্নিফায়ার’) বলা হয়। অনেক সময় জনপ্রিয়তাবাদী নেতৃত্ব সমাজের কোনো অংশের বিরুদ্ধে বা ‘বাইরে থেকে আসা’ কিংবা ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বিরুদ্ধে শিথিল জনসমর্থন গড়ে তোলে। জনপ্রিয়তাবাদ তখন হয়ে যায় অপছন্দের সংখ্যালঘু মানুষের ওপর ‘লোক-খেপানো’ রাজনীতির নামান্তর।
তবে কি আগামী দিনে এটাই আমাদের ভবিতব্য? কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যখন শ্রেণি-রাজনীতি, এমনকি উদারপন্থি নাগরিক উদ্যোগগুলো ক্রমেই পেছনের সারিতে চলে যাচ্ছে? জনপ্রিয়তাবাদ পুরনো সাংগঠনিক গণতন্ত্রের ধ্যানধারণার বদলে জনপ্রিয় নেতা-নেত্রীর সর্বময় কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এটা কিসের লক্ষণ? বাংলাদেশের মতো উত্তর ঔপনিবেশিক দেশে জনপ্রিয়তাবাদ কি পশ্চিমের মতোই চলবে, না কি তার কিছু অন্য মাত্রা আছে? সবচেয়ে বড় কথা, এই রাজনীতির সীমানা কত দূর? সেই সীমানা পেরিয়ে পূর্ণ গণতন্ত্রের প্রতি আকুতি থেকে যাওয়া দলগুলো যদি ফের ক্ষমতায় ফিরে আসে, তবে কি তারা জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতি ও তার অনুসৃত নীতিগুলো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারবে? সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে এখন এর উত্তর খোঁজাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক
লেখক ও কলামনিস্ট
